Logo
নোটিশ ::
আপনার যেকোনো সৃজনশীল লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের ঠিকানায়।আমাদের ইমেইল: hello.atharb@gmail.com

প্রথম কবিতা পত্রিকায় প্রকাশের পর আমি সেদিন রাতে ঘুমাতে পারিনি। নিজের নাম বারবার দেখেছি আর কবিতাটা বারবার পড়েছি।

অঙ্কন ডেস্ক / ২৮২ বার
আপডেট সময় : বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২০

সময়ের তরুণ  কবি বঙ্গ রাখাল  । তিনি একাধারে সাহিত্য চর্চা   ও গবেষণামূলক কাজ  করে যাচ্ছেন। নিপুণ দক্ষতায় । তার আলোকিত জ্ঞান ধারার কিছু কথা জানতে  আমরা আজ তার মুখোমুখি হয়েছি।
তার কথা জানতে আমাদের পক্ষ থেকে আলাপচারিতা করছেন- জুবায়ের দুখু

জুবায়ের; বঙ্গ দা… কেমন আছেন আপনি?

বঙ্গ রাখাল: জোবায়ের বলতে পারছি না ভাল আছি। কারণ বুকের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার ক্ষত রেখে ঠোঁট বাকিয়ে কেমন করে বলতে পারি ভাল আছি।

 জুবায়ের; করোনার এই দুঃসময়ে ঘরে বসে বসে কেমন সময় কাটছে? কি কি করছেন…

বঙ্গ রাখাল: ঘরে বসে একেবারেই সময় কাটে না। আপনি জানেন আমি একেবারেই আড্ডাবাজ মানুষ। তবুও সময়কে তো কাজে লাগাতে হবে হেলায় হারানো যাবে না এবং আমরা কবে এই মহামারি থেকে পরিত্রাণ পাব তাও নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না । সেহেতু কাজে লাগানোর চেষ্টা করছি মাত্র। এসময় অনেক কবিতা, প্রবন্ধের বই পড়েছি এবং লেখছি। কয়েকটা কবিতা লেখেছি, দুটো প্রবন্ধ লেখেছি। এই মহামারি শুধু এবারই আসেনি পৃথিবীতে অনেকবারই এসেছে এবং এসময়গুলোতে অনেক অসাধারণ সাহিত্যও সৃষ্টি হয়েছে। যেমন: শেকসপিয়ারের অনেক কালজয়ী কবিতা ও নাটক এসময় সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ “ভেনাস অ্যান্ড অ্যাডনিস’ এবং‘দ্যা রেপ লুক্রিস” এসময়ে রচিত । এমন কি মনে করা হয় তাঁর ‘ওথেলো’ নাটকটিও এসময় রচিত। বোক্কাচ্চ জিওভানির-‘দ্য দেকামেরন’, জেফ্ররি চসারের-‘দ্য ক্যন্টারবারি টেলস’, মেরি শেলির-‘ফ্রাঙ্কেস্টাইন, উইলিয়াম কেনেডির-‘আয়রনউইড, জেমস জয়েসের-‘ইউলিসিস’ এ রকম অনেক লেখকের অসাধারণ সাহিত্যকর্মের নাম উল্লেখ করা যাবে। তাই অলস সময় না কাটিয়ে একটু কাজ করে সময় অতিবাহিত করার চেষ্টা করছি মাত্র।

জুবায়ের;  ইতিমধ্যে আপনি অনেক গুলো গবেষণামূলক কাজ সম্পূর্ণ করেছে আমরা দেখেছি।বর্তমানে নতুন কোনো গবেষণামূলক কাজ করছেন কি-না জানতে চাচ্ছি….

বঙ্গ রাখাল: আমি বর্তমানে কাজ করছি লালনের সমসাময়িক ঝিনাইদহের সাধকপুরুষ পাগলা কানাইকে নিয়ে। যার ধূয়াজারি একসময় মানুষকে মাতোয়ারা করে রাখতো। মজার ব্যাপার হলো তার খালি গলার গান হাজার হাজার মানুষের কর্ণকুহরে একধরণের মুগ্ধতা সৃষ্টি করে গেছে। তাকে নিয়েই আমার ক্ষুদ্রপ্রয়াস-‘পাগলা কানাই ও তাঁর তত্ত্ব দর্শন” গ্রন্থটি। এটা মূলত একটা প্রবন্ধ সংকলন। এখানে তাকে নিয়ে অনেক পুরাতন লেখার সন্ধান পাওয়া যাবে যা তাকে পাঠকেরা নতুনভাবে  আবিষ্কার করবে বলে আমার বিশ্বাস।

জুবায়ের; আপনার ‘যৈবতী কন্যা ইশকুলে’ বইটি এবার মেলায় প্রকাশ হয়েছে, পাঠকের কাছ থেকে বইটির কেমন অনূভুতি পাচ্ছেন?

বঙ্গ রাখাল: ‘যৈবতী কন্যা ইশকুলে’ কাব্যগ্রন্থটি নিয়ে পাঠকের কাছ থেকে অনেক সাড়া পেয়েছি। অনেকে পড়ে তাদের ভাল লাগা প্রকাশ করেছেন এবং অনেকে তাদের ফেসবুক ওয়ালে তাদের প্রতিক্রিয়া শেয়ার করেছে এটা একজন কবি হিসেবে কার না ভাল লাগে বলেন।

জুবায়ের; শব্দ চয়নে আপনার কবিতার হাত একদম পাকা বইয়ে দেখলাম । আসলে আপনি কবিতায় শব্দ চয়ন কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন?…

বঙ্গ রাখাল: কবিতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে শব্দের বিকল্প কিছু হতে পারে বলে আমার জানা নাই। আপনি যখন একটি কবিতার প্লট বা কবিতা লেখার মনস্থির করবেন তখন তো আপনার ভাণ্ডারে অজস্র শব্দভাণ্ডার থাকে। অর্থাৎ সমুদ্র ছেচে মণিমুক্তা আবিষ্কার করার মত। এথেকে নিশ্চয় আপনি সব শব্দ নিয়েই কবিতা লেখবেন না বা সব শব্দই পরপর সাজাবেন না। এর মধ্য থেকে আপনার মনপুত সঠিক শব্দটিই আপনি আপনার কবিতার জন্য নির্বাচন করবেন। তাহলে শব্দচয়নের কতটুকু দরকার একটা কবিতার জন্য জোবায়ের আপনিই বলুন।

জুবায়ের;  আপনি লেখালেখিতে কিভাবে আসেন? এবং কত সাল নাগাদ লেখালেখিতে প্রথম আসেন?

বঙ্গ রাখাল: আসলে আমি লেখালেখিতে কবে কিভাবে আসি সেটা বলতে হলে বলতে হবে আমি সৃষ্টির দিন থেকেই আসি । কারণ পৃথিবীতে এসেই ক্রন্দনের মাধ্যমে আমার আগমনকে আমি জানান দিয়েছি। আর কিছু লেখার কথা বললে বলতে হয় প্রাইমারি জীবন থেকেই। ক্লাস ফোরে পড়া অবস্থায় নাটক লেখেছিলাম-‘দুষ্টু মাতবর’ এবং সেটা মঞ্চস্থও করেছিলাম। আমার অভিনয় দেখে আমার বান্ধবী সেসময় এক প্যাকেট চানাচুর উপহার দিয়েছিল। একসময় গ্রামের প্রবাদ-প্রবচন সংগ্রহ করতাম এবং এগুলোর সাথে মিল করে ছড়া লেখতাম। যেমন: চাল বেচে আটা কেনে/ কাঁঠালের উপর ঝোঁক। আলু খাবেন আস্ত তাতেই হবে স্বাস্থ্য ইত্যাদি ইত্যাদি…দুঃখিত সাল মনে করতে পারছি না।

জুবায়ের; বঙ্গ দা… সাহিত্যে আপনার প্রথম কবিতা দিয়েই পথ চলা শুরু?

বঙ্গ রাখাল: না, ছড়া।পরে কবিতা। তবে আমার প্রথমে বইও বের হয়েছে প্রবন্ধের “সংস্কৃতির দিকে ফেরা” ভুল না করলে এটি প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালে।

জুবায়ের; প্রথম কবে আপনার লেখা পত্রিকায় আসে? পত্রিকাতে সেদিন নিজের নাম দেখে কেমন অনূভুতি হয়েছিল যদি জানাতেন?

বঙ্গ রাখাল: ৬ষ্ঠ কি ৭ম শ্রেণিতে পড়ি। সেসময়ই ‘সুহৃদ’ পত্রিকায় আমার কবিতা প্রকাশিত হয় । এই কবিতা প্রকাশের পর আমি সেদিন ঘুমাতে পারিনি। নিজের নাম বারবার দেখেছি আর কবিতাটা কতবার পড়েছি তা আজ আর বলতে পারব না। খুশিতে সবাইকে পরের দিন দেখিয়ে ছিলাম এবং নিজেকে মনে হয়েছিল কোন একরাজ্যের সম্রাট দেশ বিজয় করে ফিরেছি। আজ সত্যিই হাসি পাই।

জুবায়ের;   আপনার কিছু প্রিয় লেখকের নাম বলবেন? যাদের লেখায় অনুপ্রাণিত হয়ে সাহিত্যে এসেছেন…

বঙ্গ রাখাল: আমি আসলে যাদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছি তারাই আমাদের সাহিত্যের বড় সাধক কবি। যাদের আমরা লোক কবি বলে উপেক্ষা করে চলি। অনেক গানের আসরে গেছি। কীর্তনের আসরে, গাজি গানের আসরে এসব দেখে দেখে একবার গাজির গায়েন বা কীর্তনীয়া হতে চেয়েছিলাম। তারাই আমার অনুপ্রেরণার মূল উৎস বা আগ্রহের জায়গা । একটা মানুষ কি করে এত দারুণ অভিনয় করতে পারেন। একই সাথে আবার বর্ণনা করে যাচ্ছেন গানের সুরে সুরে এদের চেয়ে বড় শিল্পী বা সাহিত্যিক কেউ আছে? আর আমার পূর্বসূরি যারা সাহিত্যের ধারাবাহিকতাকে বেগমান করে রেখেছেন তারা সবাই আমার নমস্য।

জুবায়ের; গতানুগতিক সময়ে আপনি কোনো ম্যাগাজিন সম্পাদনা করছেন?

বঙ্গ রাখাল: আমি এই সময়ে আসলে কোন পত্রিকায় সম্পাদনা করছি না কারণ আমরা আজ জনবিচ্ছিন। এক একজন নির্বাসিত। যন্ত্রণায় হৃদ্ধ হৃদয়। তবে একটু ভাল সময় হলেই বের হবে কবিতার কাগজ-‘শঙ্খধ্বনি’ এবং শিল্প সাহিত্যের ত্রৈমাসিক ‘শব্দকুঠি’।

জুবায়ের; নতুন যারা লেখালেখিতে এসেছে বা আসবে বলে মনস্থির করেছে এককথায় সমসাময়িক তরুণদের নিয়ে যদি কিছু বলেন?

বঙ্গ রাখাল: আসলে তাদের নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে বলার কিছু নেই। কারণ আমিও তাদের দলভুক্ত। এখন আমাদের একটাই কাজ প্রচুর পড়া এবং লেখা। কার কি হচ্ছে বা হচ্ছে না সে বিচার আমাদের না। সে বিচার সময়ের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। আর আমাদের আর একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে সাহিত্যে কাদাছোঁড়া ছুড়ি বন্ধ করে একনিষ্ঠভাবে সাহিত্যেচর্চা করলে তবেই বের হয়ে আসবে সঠিক সাহিত্য। সময়ের অপেক্ষা মাত্র।

  জুবায়ের; শেষ প্রশ্ন বঙ্গ দা… আপনার স্মৃতিচারিত একটা শৈশব কৈশোরকালীন ঘটনা যদি বলতেন। যা এখনো আপনাকে ডাকে….

বঙ্গ রাখাল: আমার বাবা ছিলেন গান-বাজনা পাগলা একজন মানুষ। তিনি গান গাইতেন না কিংবা তিনি লিখতেনও না। তবে যেখানেই গান-বাজনা হোক না কেনো তিনি যেতেন গ্রামে যাকে বলে আমুদে মানুষ। গ্রামে শীতের রাতে প্রচুর গাজির গানের আসর বসে। এই আসর বসলেই বাবা আমাকে নিয়ে যেতেন এবং তার গায়ের কালো শালের চাদরটা আমাকে জড়িয়ে দিতেন। আমি সারা রাত জেগে জেগে সেই আসরের সামনে বসে গাজির গান দেখতাম। বাবা মাঝে মাঝে এসে আমাকে ঝুড়িভাজা বা চানাচুর,পিয়াজু, চা দিয়ে যেতেন আর কোন সমস্যা হচ্ছে কিনা জাতে চাইতেন? ঘুম পাচ্ছে কিনা খোজখবর নিয়ে নিজের মত থাকতেন। এখন বাবাও নেই। সেই সময়টাও নেই। হাজার ইচ্ছা করলেও ফিরে যেতে পারি না। কালের গহবরে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম সংস্কৃতি। এসব কথা মনে হলেই মনের মধ্যে হু হু করে ওঠে।

জুবায়ের; ধন্যবাদ বঙ্গ দা… নানা ব্যস্ততার মাঝেও আমার প্রশ্নের উত্তর গুলো দেওয়ার জন্য..

বঙ্গ রাখাল: আপনাকেউ অনেক অনেক ধন্যবাদ।


এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com