Logo
নোটিশ ::
আপনার যেকোনো সৃজনশীল লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের ঠিকানায়।আমাদের ইমেইল: hello.atharb@gmail.com

ডিপ্রেশন ও একটি মৃত্যু —১ম পর্ব || ফাতেমা আকন পিউ

অঙ্কন ডেস্ক / ৪৬৪ বার
আপডেট সময় : বৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২০

  • ডিপ্রেশন ও একটি মৃত্যু— ১ম পর্ব
    ফাতেমা আকন পিউ

.

মাকড়শার জালে ভরে আছে পুরোনো স্টাডি রুম। নতুন রূপে সাজিয়ে তোলা এই বিশাল বাড়িতে এখন বলতে গেলে এই একটি রুম আছে যা এই বাড়ির জন্ম থেকেই রয়েছে। যে রুমটি এক সময় আলোতে ভরে থাকতো, যে টেবিলে এক সময় ডায়েরি আর বইয়ের মেলা বসতো, যে টেবিলের কাঠে শুকিয়ে আছে হাজারো অশ্রু। যে রুমের দেয়াল জানে হাজারো গোপন কথা, কিন্তু আজ ২০ বছর ধরে নিষ্প্রাণ হয়ে বন্ধ এই রুমটি। আজ নেই কোনো আলো, নেই বইয়ের মেলা। কিন্তু আছে সেই লুকিয়ে থাকা গোপন কথা।

পুরোনো চাবির গোছা থেকে বেশ কয়েকটি চাবি খুঁজে অবশেষে স্টাডি রুমের দরজা খুলে জেনিফা। কি করবে? ১৬ বছরের এই মনে যে কৌতূহল খুব বেশি। তার জানতে ইচ্ছে করে কি আছে এই দরজার পেছনে! কেন এই দরজা কেউ খুলে না! কি রহস্য এই রুমের!! তাই তো আজ বাবা মায়ের অজান্তে বাড়ির সকলের ঘুমিয়ে যাওয়ার পর এই দরজা খুলেছে সে।

ঘুটঘুটে অন্ধকার রুমটি। হাতের মোবাইলের আলোয় ভেতরে প্রবেশ করে জেসিকা। বন্ধ ঘরের এক বিটকুটে গন্ধ তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। ওড়না দিয়ে মুখ চেপে ধরে মোবাইলের আলোয় জানালা খুঁজতে শুরু করে জেনিফা। দেয়ালের একপাশে ধুলো ময়লা জমে থাকা একটা জানালা দেখতে পায় সে। জানালার সামনের জাল গুলো সরিয়ে খুলে দেয় জানালাটা। জানালা খুলতেই বাইরের ঠান্ডা বাতাস স্পর্শ করে জেনিফাকে। সাথে চাঁদের আলো। চাঁদের আলো জানালা দিয়ে ভেতরে আসছে। যেন মনে হচ্ছে চাঁদ এখানে দাঁড়িয়েই অপেক্ষা করছিল এই জানালার।

জানালার কাছ থেকে সরে জেনিফা এই রুমটি দেখতে শুরু করে। এই রুমের তিনটি দেয়াল জুড়ে কাঠের সেল্ফ। যাতে রয়েছে হাজারো বই। আর ঠিক মাঝখানে কাঠের টেবিল আর চেয়ার। টেবিলের উপর রাখা কয়েকটি আঁকা ছবির কাগজ তার পাশে পড়ে থাকা কিছু রঙ পেন্সিল আর ছোট একটি টেবিল ল্যাম্প। জেনিফা কাগজ গুলো তুলে নিয়ে জানালার পাশে যায়। হাত দিয়ে ঝেড়ে কিছুটা ধুলো ঝাড়িয়ে দেখে সেই ছবি গুলো। কি নিখুঁত রঙ পেন্সিলের খেলা! কত সুন্দর আঁকা ছবি! এমন হাত একজন পারদর্শী চিত্রকারেরই হতে পারে। প্রতিটি ছবিতে একটি মেয়েকেই আঁকা আছে। নানা পোশাকে, নানা সাজে। কখনো ফুলের রাণী, কখনো গহণার রাণী। বা কখনো সাধারণ ভাবেই। কিন্তু প্রতিদিন ছবির নিচে ছোট করে লেখা, ” আমার স্বপ্নের রাণী “। তার মানে এই ছবিটির সাথে অনেক কথা অনেক গল্প জুড়ে আছে এই রুমের চার দেয়ালের ভেতর। ছবির কিছু কিছু জায়গায় রঙ গলে গিয়েছে। যেমনটা বিন্দু বিন্দু পানি পড়লে হয়। কিন্তু এ কি কোনো পানি নাকি কারো বুক ভরা কষ্টের চিহ্ন? কেউ কি ভিজিয়েছিল তার চোখের জলে এই মায়াবতীর ছবি গুলো? কারো বুকের কষ্টের কথা গুলো কি এত বছরেও স্বাক্ষী দিয়ে যাচ্ছে এই কাগজ গুলো? এই রঙ এক দিনে গলে নি। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কেউ নিজের চোখের জলে ভিজিয়েছে এই মায়াবতীর ছবি।

ছবি গুলো টেবিলে রেখে ফোনের আলোয় বই গুলো দেখতে শুরু করে জেনিফা। অনেক অনেক বই। অনেক নাম না জানা দেশ বিদেশের লেখকদের বই। কোথাও পড়ার বই। কোথাও পুরোনো ক্যালকুলেটর, কোথাও জ্যামিতি বক্স। আবার কোথাও মোটা মোটা খাতা। এগুলো দেখে এটা জেনিফার কাছে স্পষ্ট যে এই রুমে যে পড়তো বা যার এই রুম ছিল সে বই পড়ুয়া ছিল। তার শখ ছিল এই বই। আর নেশা ছিল ছবি আঁকার। নয়তো শখের বশে এতো নিখুঁত ছবি কেউ আঁকতে পারে বলে জেনিফার জানা নেই। বিশাল বিশাল বইয়ের মাঝে হাত বুলাতে বুলাতে এগিয়ে যাচ্ছে জেনিফা। হঠাৎই তার চোখ পড়ে একটি ছোট বেগুনি রঙের কভারে মোড়ানো বইয়ের দিকে। পাশের বই গুলো কিছুটা সরিয়ে সেই বেগুনি রঙের কভারে মোড়ানো বইটি বের করে নেয়। বেগুনি কভার নয়, বেগুনি মসলিন কাপড়ে পেঁচিয়ে রাখা ছিল সেটি। ছোঁয়ার আগে দেখে কভার মনে হয়েছিল। কাপড়টি সরাতে সরাতে জানালার কাছে আসে জেনিকা। জানালার কিনারায় উঠে বসে সে। এভাবে বসে বই পড়তে তার বেশ লাগে। কিন্তু তার হাতে আজ বই নেই। আছে নীল রঙের একটি ডায়েরি। সেই মসলিনের কাপড়ে মোড়ানো ছিল এই ডায়েরি। এতো যত্ন করে এভাবে রাখার মানে নিশ্চয়ই এই ডায়েরিতে কোনো বিশেষত্ব আছে। নয়তো এতো যত্নে কেন থাকবে এই ডায়েরি? এতোটা যত্নে তো ওই মায়াবতীর ছবিও নেই!

ডায়েরির পাতা উল্টে দেখছে জেনিফা। এই ডায়ের প্রতিটি পাতায় কলমের কালি গলে আছে বিন্দু বিন্দু পানিতে। এ এক গোপন ব্যথার চিহ্ন যার স্বাক্ষী এই ডায়েরি। ডায়েরিটি দেখে আর সেখানের লেখা গুলো দেখে জেনিফার আগ্রহ হয় এই ডায়েরি সম্পর্কে জানার। ডায়েরিটি পড়তে পড়তে জেনিফা নিজেই হারিয়ে যায় সেই সময়ে…..

হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভিড় ঠেলে নোটিশ বোর্ডে নিজের নাম খুঁজছে রাফসান। বুক ভরা স্বপ্ন মন ভরা আশা নিয়ে সে এগিয়ে চলেছে। আজকের এই মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলই পারে তাকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। জীবনের চলার পথের বড় সাথী এই লেখাপড়া। যার কেউ নেই তার সাথে সৃষ্টিকর্তা যেমন আছেন ঠিক তেমনি আছে এই সার্টিফিকেট গুলো। সবাই ছেড়ে চলে গেলেও বিদ্যা যায় না। সবাই ধোকা দিলেও ধোকা দেয় না বিদ্যা। বরং সে তৈরি করে আত্মবিশ্বাস , তৈরি করে এক নতুন জীবন। আজ রাফসানের জীবনেও এমন একটি দিন। তার দশ বছরের কষ্টের ফল পেতে চলেছে সে। এই দিনটি তার জন্য অনেক অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

নোটিশ বোর্ডে অবশেষে নিজের নাম খুঁজে পেল রাফসান। তেমন ভালো ফলাফল না হলেও খারাপ হয় নি। আর তার জন্য এই রেজাল্টই অনেক। অন্তত কলেজে ভর্তি তো হতে পারবে সে। কিন্তু তাও মনে ভয়, আজ কি হবে তার সাথে! তার হাতে পাওয়া রেজাল্ট সে নিজে আনে নি, এনেছে তার পরিবার। যে ছেলে পড়াশোনার এত আগ্রহ নিয়ে রাতের অন্ধকারে মোমবাতি জ্বালিয়ে লুকিয়ে পড়ে সব সময় ক্লাসে প্রথম হতো সেই ছেলে আজ সামান্য নম্বর পেয়ে পাস করেছে। এটা খুবই দুঃখজনক। এই সবার মাঝে প্রশ্ন জাগে, কেন রাফসান এতো কম নম্বর পেলো? কেন তাকে লুকিয়ে রাতের অন্ধকারে মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়তে হয়? তার উত্তর রাফসান নিজেও জানে না।

সম্পর্কের মায়াজাল অনেক কঠিন। এই জালে বন্দী সবাই কোনো না কোনো সূত্রে গাঁথা। ভেঙে যাওয়া সম্পর্কও কোনো না কোনো সুতোয় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাঁধাই থাকে। আমরা চাইলেও সেই সম্পর্ক বিচ্ছেদ করতে পারি না। কেননা তা থাকে আত্মার ও রক্তের সম্পর্ক।


এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com