Logo
নোটিশ ::
আপনার যেকোনো সৃজনশীল লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের ঠিকানায়।আমাদের ইমেইল: hello.atharb@gmail.com

উপন্যাসঃ ডিপ্রেশন ও একটি মৃত্যু —৭ম পর্ব || ফাতেমা আকন পিউ

অঙ্কন ডেস্ক / ২৭৩ বার
আপডেট সময় : শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২০

প্রকৃত বন্ধু সেই যে নিজের জীবনের কথা না ভেবে ছুটে যায় বন্ধুর জন্য। প্রকৃত বন্ধু সেই যে বন্ধুর চোখের এক ফোটা জল নিজের শরীরের রক্ত মনে করে। প্রকৃত বন্ধু সেই যে মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত হাত ছাড়ে না তার বন্ধুর। কিন্তু আমরা প্রকৃত বন্ধু চিনতে পারি না। কিছু স্বার্থপর বন্ধুর জন্য মিটে যায় প্রকৃত বন্ধুর চিহ্ন। সত্যি বলতে এখন স্বার্থ ছাড়া কে চলে? সবাই স্বার্থের পিছু ছুটে। তফাৎ এতটুকুই, কেউ বেশি স্বার্থ খুঁজে কেউ বা কম।

রাফসানের জীবনে আসে এক নতুন বন্ধু। জুলিয়া। নিঃসঙ্গ জীবনে চলা এক মেয়ে। মাকে হারিয়ে ফেলে জন্মের আগেই। মৃত্যু মায়ের গর্ভ থেকে পৃথিবীর আলো দেখে জুলিয়া। জুলিয়ার বাবা খুবই লোভী মানুষ ছিলেন। জীবনে নিজে ইনকাম করে খেয়েছেন তা নয়। যাকে পেরেছেন তার থেকেই সব ছিনিয়ে নিয়েছেন। বিয়ে করেছিলেন ছয় সাতটা। তাও এমন পরিবারের মেয়েকে যার দুনিয়ায় কেউ নেই। আছে প্রচুর সম্পত্তি। যদি জুলিয়ার সেই সৎ মায়েরা বেঁচে থাকতেন তবে জুলিয়ার অনেক ভাই বোন থাকতো। কিন্তু জুলিয়ার বাবার সৌভাগ্যক্রমে সব সম্পত্তি উনার নামে করে দিয়েই নিজেদের সন্তান গর্ভে নিয়েই সবাই গলায় দড়ি দেন। উনাদের সাথে সাথে না ফেরার দেশে চলে যায় সেই ছোট প্রাণ গুলিও। কিন্তু জুলিয়ার মা একা ছিলেন না। উনার খালা ছিলেন। যিনি একজন ডাক্তার। এই কথা জুলিয়ার বাবা জানতেন না। একদিন জুলিয়ার বাবা জুলিয়ার মায়ের কাছে সম্পত্তির কাগজ নিয়ে আসেন। জুলিয়ার মা জানতে চান এটা কিসের কাগজ। জবাবে তিনি বলেন জুলিয়ার জন্মের জন্য হাসপাতালে রোগীর স্বাক্ষর করা কাগজ জমা করতে হবে। জুলিয়ার মা কাগজে স্বাক্ষর করার সঙ্গে সঙ্গে উনার প্রসব ব্যথা শুরু হয়। কিন্তু জুলিয়ার বাবা উনাকে হাসপাতালে না নিয়ে বুকের উপর থেকে ওড়না নিয়ে তা গলায় পেচিয়ে ধরে। অসুস্থ শরীরে পেরে উঠে না জুলিয়ার মা। বিছানার চাদর খামছে ধরে অপেক্ষা করেন মৃত্যুর। তখনই বাইরে গাড়ির শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। জুলিয়ার মাকে ফেলে জানালা দিয়ে পালিয়ে যান জুলিয়ার বাবা। দরজায় কড়া নাড়তে নাড়তে ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে প্রতিবেশীদের সাহায্যে ঘরে ঢুকেন জুলিয়ার মায়ের খালা। ততক্ষণে জুলিয়ার মা মারা যান। ডাক্তার হওয়ার সুবিধার্থে তিনি মৃত মায়ের গর্ভ থেকে বের করে পৃথিবীর আলো দেখান জুলিয়াকে।

ছোট জুলিয়ার দায়িত্ব বহন করে জুলিয়ার ফুফু নিগার। করবে নাই বা কেন! এত সম্পত্তির মালিক এখন জুলিয়াই তো। জুলিয়ার বাবা সেদিন পালিয়ে যাবার সময় ট্রাকের ধাক্কায় চুর্ণবিচুর্ণ হয়ে যান। আর উনার সব সম্পত্তির মালিক হয়ে যায় ছোট্ট জুলিয়া। বাবা মায়ের অভাব তার চিরকালের। ফুফু বিয়ে করে জুলিয়াকে নিজের সংসারে নিলেও দেয়নি সন্তাদের ভালোবাসা। করেছে লোক দেখানো লালন পালন। এতো টাকার সম্পত্তি হাত ছাড়া হয়ে যাবে এই ভেবে জুলিয়াকে রাখে চোখে চোখে। কারো সাথে কথা নয়, বাইরে যাওয়া নয়। বন্দী চার দেয়ালের ঘরে।

নিজের সম্পর্কে এ সব কথা জুলিয়া রাফসানকে বলে। জুলিয়ার কথা শুনে নিজের অজান্তেই কাঁদে রাফসান। এতদিন রাফসান ভাবতো পৃথিবীতে সে একাই এতো দুখী। তার মতো বাবা মায়ের ভালোবাসা না পাওয়া হয়তো আর কেউ নেই। কিন্তু রাফসান আজ বুঝতে পারে তার থেকেও কষ্টে আছে জুলিয়া। জুলিয়ার সব কথা শুনে রাফসান নিজের কথাও বলে জুলিয়াকে। বাবা মা বন্ধু সব কিছু। তার জীবনের খুঁটিনাটি। রাফসান জানে না ফোনের ওপাশের মানুষটা তার এই কথা গুলো কিভাবে নিচ্ছে। কিন্তু আজ রাফসান কথা গুলো বলে শান্তি পাচ্ছে। তার মনে হচ্ছে কোনো আপন কাউকে যে তার কষ্টের কথা বলছে। এমন আপন কেউ, যাকে রাফসানের প্রয়োজন ছিল অনেক আগেই।

রাফসান আর জুলিয়া সময়ের সাথে সাথে খুব ভালো বন্ধু হয়ে উঠে তারা। জুলিয়ার সাথে ঘটা অত্যাচার রাফসানকে বলে। রাফসানও বলে জুলিয়াকে তার সাথে ঘটা অত্যাচারের কথা। এক সময় রাফসান বুঝতে পারে জুলিয়া তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছে। রাফসান নিজের জীবনের অস্থায়ী তাবুটার কথা ভেবে পিছিয়ে আসে। কমিয়ে দেয় জুলিয়ার সাথে যোগাযোগ রাখা। আগে সারা রাত কথা বলে কাটালেও এখন খুব কম কথা বলে। এমন নয় যে রাফসানের মনে জুলিয়ার জন্য ভালোবাসা নেই। রাফসান নিজেও বুঝতে পারে সে জুলিয়াকে ভালোবাসে। কিন্তু তার নিজের জীবনই নড়বড়ে। নিজের কোনো সম্মান নেই তার জীবনে। তাহলে অন্য একজনকে জড়ানো কি ঠিক?

জুলিয়া রাফসানকে কতটা ভালোবাসে তা জুলিয়াই জানে। হয়তো এতটা ভালোবাসে যে নিজের উপর অত্যাচারের পাহাড় নিয়েও রাফসানকে ফোন করে, যোগাযোগ করে। কিন্তু রাফসান যত সময় যায় ততই দূরে সরে যায়। কিন্তু এভাবে আর কত দিন? আর কত দিন নিজের ভালোবাসা লুকিয়ে রাখবে রাফসান?

আজ রাফসানের জন্মদিন। মাহা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর আর কেউ পালন করেনি তার জন্মদিন। কিন্তু ঠিক রাত বারোটায় আজ তার ফোন বেজে উঠে। মাহার ফোন ভেবে নাম্বার না দেখেই রিসিভ করে রাফসান। আর চমকে উঠে ওপাশের কন্ঠ শুনে।

” শুভ জন্মদিন রাফসান। ”

” জুলিয়া!!! ”

” হ্যাঁ জুলিয়া। এত দিন হয়ে গেল ঠিক মতো কথাও বলছো না। ”

” আমি ব্যস্ত ছিলাম জুলিয়া। ”

” আজ তোমার জন্মদিন, আজ অন্তত মিথ্যা বলো না। তুমি আমার কাছ থেকে পালিয়ে যাচ্ছো। ”

” হ্যাঁ আমি তোমার থেকে দূরে যেতে চাই। ”

” কিন্তু কেন? তুমি কি সত্যি বুঝতে পারো না কিছু? ”

” আমি বুঝতে পারছি। তাই পালাতে চাইছি। দেখো জুলিয়া, আমার নিজের জীবনটাই অস্থায়ী এক তাবুর মতো। যেকোনো সময় ঝড়ে হারিয়ে যেতে পারে। তুমি আমার সম্পর্কে সব জানো। আমার পরিবার সম্পর্কে জানো। ”

” সব জেনেই তো ভালোবেসেছি। আমি তোমার পরিবার, সম্পত্তি এসব দেখে ভালোবাসিনি। আমি তোমাকে ভালোবেসেছি। তোমার মনকে ভালোবেসেছি। তোমার ভেতরে থাকা সত্যবাদীকে ভালোবেসেছি। তুমি কি আমাকে গ্রহণ করবে না? আমি তোমার সাথে কথা বললে ভুলে যাই আমার সব কষ্ট। আমি নিজেকে নতুন রূপে দেখতে পাই। আমি তো জন্ম থেকেই একা। আমাকে ভালোবাসার কেউ নেই। তুমি ভালোবাসবে আমাকে? কোনো অভিযোগ করবো না। শুধু ভালোবাসা চাই। ”

” আমার পাশে থাকবে সব সময়? ”

” থাকবো। মৃত্যু পর্যন্ত আমি তোমার সাথে থাকবো। এই নরকে আর পুড়তে চাই না। আমাকে এবার একটু শান্তি দাও। আমি তোমার সাথে তোমার ভালোবাসায় সব ভুলে থাকবো। সুখে দুখে তোমার পাশে থাকবো। “


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com