Logo
নোটিশ ::
আপনার যেকোনো সৃজনশীল লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের ঠিকানায়।আমাদের ইমেইল: hello.atharb@gmail.com

উপন্যাস: ডিপ্রেশন ও একটি মৃত্যু —৫ম পর্ব || ফাতেমা আকন পিউ

অঙ্কন ডেস্ক / ৩২৩ বার
আপডেট সময় : বুধবার, ১৭ জুন, ২০২০

সুখের রাজ্যে ডুবে যায় রাফসান। মামা, মামী, মামাতো ভাই আর ভাবী মাহা হয়ে উঠে তার নতুন পরিবার। তার এক জগৎ। যেখানে নেই কোনো দুঃখ নেই কোনো কষ্ট। রাফসানের বাবা মাও পাল্টে যায় মাহা এই সংসারে আসার পর থেকে। রাফসানকে রাহাতের মতোই ভালোবাসে। এত বছরে মনে হয় এখন রাহাত আর রাফসান দুই ভাই।

সময় কেটে যায়, রাফসান ভার্সিটিতে ভর্তি হয়। ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলে সামনের দিকে। কিন্তু কে জানতো রাফসানের সুখের সময় মাত্র কদিনের ছিল? চলে গেলেন রাফসানের মামা। তার ভরসা, তার বিশ্বাস। বাবার মতো আগলে রাখা মামা তাকে ছেড়ে চলে যায় না ফেরার দেশে। কখনো আর ফিরে এসে তিনি বলবেন না, ” রাফসান, খেতে আয়। ” কখনো আর তিনি নিজের হাতে খাইয়ে দিবেন না রাফসানকে। নিজে পছন্দ করে কাপড় কিনে দিবেন না। রাফসানের মাথার উপর থেকে হাত সরিয়ে চলে গেলেন চিরতরে।

সেদিন রাফসানের পরীক্ষা ছিল। পরীক্ষার হলে কলমের সাথে যুদ্ধ করা রাফসান জানে না তার মামা হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করছে। সুস্থ সবল মানুষ রাফসানকে পরীক্ষার হলে পৌঁছে দিয়ে রওনা দেয় অফিসের দিকে। কিন্তু পেছন থেকে রাক্ষস রূপে এক বাস এসে তার চাকায় পিষ্ট করে চলে যায়। রাফসান এখনও জানে না কি হয়েছে। সে ব্যস্ত পরীক্ষা নিয়ে। তার স্বপ্ন পূরণ নিয়ে। সে কি ফিরে এসে দেখতে পাবে তার মামার হাসি মাখা মুখ! নাকি সাদা কাফন!

পরীক্ষা শেষ করে বাসায় ফিরে রাফসান। রিকশা থেকে নেমে দেখে তাদের বিল্ডিংয়ের সামনে অনেক ভীড়। বুঝতে পারে না রাফসান। বাসার সামনে এতো ভীড় কেন তা দেখতে ভীড় ঢেলে ভেতরে যায় । ভেতরে গিয়ে দেখে তার মামা সাদা কাফনে মুড়ে শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে। এই ঘুম কখনও ভাঙ্গবে না। ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় রাফসান। মামার সাথে কাটানো মুহূর্তের কথা বলতে থাকে। তার ধারণা মামা জেগে উঠবেন। বলতে বলতে একসময় চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে রাফসান। তার কান্না দেখে উপস্থিত সবাই কাঁদে। রাফসানের কান্না সকলকে বুঝিয়ে দেয় মামা তার কাছে অমূল্য সম্পদ ছিল।

দিন কেটে যায়। রাফসান এগিয়ে যায় তার স্বপ্ন পূরণ করতে। কিন্তু সুখ তার হারিয়ে যায়। মামা মারা যাবার পর মামীকে নিয়ে মামাতো ভাই আমেরিকা চলে যায়। বন্ধু বলে নেই কেউ এখন। ছিল ভাবী! মাহাও রাহাতকে নিয়ে কানাডা চলে যায়। একা হয়ে যায় রাফসান। বাবা মা আর সে। তিনজনে পরিনত হয় তাদের পরিবার। সবাই বলে ছোট পরিবার সুখি পরিবার। কিন্তু রাফসান কি সুখি? বাবা মা নিয়ে ভালোভাবে আর দশজন থাকলেও থাকতে পারে না রাফসান। থাকবেই বা কি করে! বেকার ছেলে যে সে।

আমাদের দেশে চাকরি এক সোনার হরিণ। লাখ লাখ সার্টিফিকেট নিয়েও পাওয়া যায় না সেই মায়া হরিণকে। কিন্তু এ কথা কজন বুঝে? কটা পরিবার হাসি মুখে মেনে নেয় তাদের বেকার ছেলেকে? পড়া শেষ এবার চাকরি করো। না পেলে বেরিয়ে যাও। নিজের উপর পড়লে সব করা শিখবে। এমন কথা অনেক বাবা মা বলে থাকেন। এটা সত্য কথা। একটু খোঁজ নিলেই দেখবেন আপনার আশেপাশের মানুষের ঘরে প্রায় ঝগড়া হয়। ছেলে বড় গলায় কথা বলে বাবা মায়ের সাথে। আমাদের ভদ্র সমাজ তখন সেই ছেলেকে একটা উপাধি দেয়। বখাটে, বাজে, অভদ্র। কিন্তু আমরা কি জানতে চেয়েছি সে কেন এভাবে কথা বলছে? না, আমরা তা জানতে চাই না। ছেলেটা বাজে। রাস্তার মোড়ে ছিনতাই করে। হ্যাঁ এটা ঠিক অনেকে সঙ্গ দোষে খারাপ পথে যায়। কিন্তু অনেকে নিজের ঘরে শান্তিতে থাকতে এই পথ বেছে নেয়। বাসায় খেতে বসলো। বাবা এসেই দিলেন বিখ্যাত বাণী, ” এভাবে আমার ঘাড়ে আর কত দিন? ” না, এটা সিনেমাতেই নয়। বাস্তব জীবনেও হয়। একটু খোঁজ নাও, তবেই জানবে। বাসায় আসলেই মা জানতে চাইবেন, ” টাকা পেয়েছিস? আমি কিছু জানতে চাই না, আমার টাকা চাই। ” না, এটা কোনো সৎ মায়ের বাণী নয়। নিজের মায়ের বাণী৷ এমন অনেক আছে। আত্মহত্যা করলে আমরা বলি প্রেমে ব্যর্থ। তাই আত্মহত্যা করেছে। আরও একটা টপিক সেটা হলো রেজাল্ট। কিন্তু এই রেজাল্ট ছাড়াও পরিবারের জন্য চাকরি করতে না পেরে হাজার হাজার সন্তান আত্মহত্যা করে। যাদের বেশিরভাগই আমাদের কাছে প্রেমে ব্যর্থ বলে পরিচিত।

রাফসান তার পড়া শেষ করেছে। শেষ করেছে বললে ভুল হবে। বর্তমানে বন্ধ আছে। অনার্স পাসের সার্টিফিকেট অনেক বেশি। এমনটা তার বাবা মায়ের কথা। এখন রাফসান নিজের খরচ নিজেই চালাতে হবে। আর সম্ভব না হয়ে বেরিয়ে যেতে হবে। এখন আর তাদের মধ্যে ভালোবাসা নেই রাফসানের জন্য। আছে ঘৃণা। প্রচুর ঘৃণা। সারাদিন ঘুরে একটা চাকরি জোগাড় করতে না পারে না রাফসান। সেই সময় তার পাশে এসে দাঁড়ায় তার কিছু বন্ধু। কথায় আছে বিপদে বন্ধুর পরিচয়। রাফসান তার এই চরম বিপদে প্রকৃত বন্ধুদের পেয়েছে। চাকরি না পাওয়ায় যেখানে নিজের বাবা মা ঘর থেকে বের করেই দেয়, সেখানে রাফসানের বন্ধুরা তাকে আগলে রেখে নিজেদের কাছে রাখে। বন্ধুদের পরিবার তাকে আপন করে নেয়। যোগ্যতা দেখে ভালো কোনো কোম্পানি না পাওয়ায় তারা তাকে ছোট খাটো একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দেয়। যার ইনকাম দিয়ে সে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে পারবে। বাবা মায়ের হাতেও কিছু তুলে দিতে পারবে। যা পেয়ে তাদের কাছে অন্তত কিছুটা ভালো থাকবে রাফসান।

বন্ধুদের সাথে আড্ডা, অফিস আর পড়াশোনা এসব নিয়ে ভালোই কাটছে রাফসানের দিন। মামাতো ভাই আমেরিকা থেকে তার জন্য গিফট পাঠায়। হাত খরচের জন্য টাকা দেয়। ভাবী মাহাও তার জন্য এটা সেটা পাঠায়। শ্বশুর শাশুড়িকে না জানিয়ে রাফসানকে টাকা দেয় যাতে সে ভালো ভাবে চলে ফিরে খেতে পারে। বলতে গেলে রাফসানের দুঃখের ইতি ঘটে প্রায়। নিজের বাবা মা পুরোপুরি নয়, কিছুটা ভালোবাসা দেখায় রাফসানের প্রতি। আসলে কিছু মানুষের স্বভাবই এমন হয়। ভালোবাসা কখনও প্রকাশ করে না। হোক নিজের ছেলে। স্বভাব তো স্বভাবই।

কথায় আছে দুঃখরা সাত ভাই। একজন আসলে বাকিরাও পিছু পিছু চলে আসে। আবার যেতে শুরু করলে এক ভাইয়ের পিছু নিয়ে বাকি ছয় ভাই পালায়। কিন্তু সুখেরাও কি ভাই, নাকি বোন! হয়তো তারা বোন। দুঃখের বিপরীতে যদি সুখ হয় আর দুঃখরা ভাই হয় তাহলে সুখ নিশ্চয়ই বোন হবে। হ্যাঁ সুখেরাও সাত বোন। একজন কারো জীবনে এলে বাকিরাও ছুটে আসে তার জীবনে। তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ রাফসান।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com