Logo
নোটিশ ::
আপনার যেকোনো সৃজনশীল লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের ঠিকানায়।আমাদের ইমেইল: hello.atharb@gmail.com

একজন আদর্শ শিক্ষকের গল্প :: রিয়াজ উদ্দিন

অঙ্কন ডেস্ক / ২৯০ বার
আপডেট সময় : শনিবার, ৬ মার্চ, ২০২১

বিংশ শতকের নব্বইয়ের দশক। হাওরাঞ্চল খ্যাত সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার টাংগুয়ার হাওর পাড়ের গ্রামগুলোতে তখনো পৌঁছায়নি শিক্ষার হাওয়া। নানান প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করে জীবনযাপন করে টাংগুয়ার পাড়ের মানুষেরা। অর্থনৈতিক সমস্যা আর পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার অভাবের কারণে তখনো কেউ চিন্তাও করতে পারতেন না যে ঐ প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে কেউ হতে পারেন একজন উচ্চ শিক্ষিত, কেউ হতে পারেন জ্ঞানের আলোয় আলোকিত । বলা হয়ে থাকে, পিতা-মাতার চিন্তার উপর অনেকাংশে নির্ভর করে সন্তানের ভবিষ্যৎ। তৎকালীন সময়ে, টাংগুয়ার পাড়ের অবিভাবকবৃন্দের চিন্তা চেতনায় একটি জিনিসেই ছিল তা হলো সন্তান একটু বড় হলেই তাকে অর্থ উপার্জনে নিয়োজিত করা। এখনো অনেক অভিভাবক শিক্ষার চেয়ে সন্তানকে অর্থ উপার্জনে নিয়োজিত রাখতে অনেক বেশি আগ্রহী ও সচেষ্ট দেখা যায় ।

 

টাংগুয়ার হাওর পাড়ের একটি গ্রাম ‘ছিলানী তাহিরপুর’। ঐ গ্রামের কৃষক ছুরত আলীর সাত সদস্যের পরিবার। পরিবারের তৃতীয় সন্তান মাফিকুল ইসলাম তবে বাবা তাকে আদর করে ডাকতেন উজ্জল নামে । তিনি হয়তো বিশ্বাস করতেন তার ছেলে উজ্জ্বল করবে তার এবং তার গ্রামবাসীর মুখ। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন তাকে লেখাপড়া করাবেন। তাকে একজন মহান মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন।

 

সন্তানকে নিয়ে দেখা পিতামাতার স্বপ্নগুলো সাধারণত অবিনশ্বর হয়। মৃত্যু ব্যতীত তাদেরকে থামাতে পারেনা। ব্যতিক্রম ঘটেনি জনাব ছুরত আলীর ক্ষেত্রেও। তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন তার ছেলেকে লেখাপড়া করানোর বিষয়ে। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় টাংগুয়ার পাড়ের নানান সমস্যার উত্তাল ঢেউ স্তব্ধ করে দেয় মাফিকুল ইসলাম-এর জীবন। বন্ধ হয়ে যায় লেখাপড়া। জীবনটা যে ফুলশয্যা নয়, জীবন মানেই যে একটা সংগ্রাম তা আমরা হয়তো বইয়ের পাতায় দেখি কিন্তু ঐ হাওর পাড়ের মানুষেরা প্রতিনিয়ত তা করে দেখায়। জীবনের প্রতিটি ধাপে ধাপে সংগ্রাম করে বাঁচতে হয় ওদের। একবিংশ শতাব্দীর এই সময়েও, হাওর পাড়ের শিক্ষার মানোন্নয়নে বিশেষ কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় নি । অকালে ঝরে যায় কতো মেধাবী ফুল। হয়তো তাদের মধ্যে থেকেও উঠে আসবে দেশের খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব তবে তার জন্য বিশেষ নজর দিতে হবে হাওর পাড়ের শিক্ষার উন্নয়নের ক্ষেত্রে ।

 

সন্তান আর পিতামাতার লক্ষ্য যখন একই সুতায় গাঁথা হয় তখন বিজয় অবশ্যম্ভাবী। যত বড় বাঁধা আসুক না কেন উত্তরণ হবেই। মাফিকুল ইসলাম চেষ্টা করছিলেন কীভাবে লেখাপড়া আবার শুরু করা যায়। তার জীবনের ঘোর অন্ধকারে আলোকবর্তিকা হয়ে উপস্থিত হলেন একজন শিক্ষক চিত্তরঞ্জন সরকার। শিশু হলো উদ্যানের চারাগাছ আর শিক্ষক হলেন তার মালী। শিশুর সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করার কাজটি করে থাকেন শিক্ষক। তিনি তার শিক্ষক চিত্তরঞ্জন সরকারের উৎসাহ,উদ্দীপনা আর দিকনির্দেশনায় সমাপ্ত করলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়াশোনা।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে ভর্তি হলেন ‘ট্যাকেরঘাট চুনা পাথর খনি উচ্চ বিদ্যালয়ে’। তার গ্রাম থেকে বিদয়ালয়টির দূরত্ব প্রায় ছয় থেকে সাত কিলোমিটার। এই দীর্ঘ পথ হেটে হেটে পাড়ি দিয়ে প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া অনেকটা কষ্টের যে কারণে একদিন পরপর স্কুলে যেতেন তিনি।এত দীর্ঘ রাস্তা অতিক্রম করে লেখাপড়া চালানো দিনদিন কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে আসছিল । তিনি খুঁজছিলেন নতুন পথ। প্রবাদ আছে, ইচ্ছে যেখানে আছে উপায় একটা হবেই। তার এক মামার সহযোগিতায় তিনি ভর্তি হলেন সিলেটের বিশ্বনাথে ” রামসুন্দর অগ্রগামী উচ্চ বিদ্যালয়য়ে “। নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন,’ আমি আমার জীবনে শেষ দিন পর্যন্ত আমার লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে যাব “। তিনিও সেই কাজটি করেছিলেন। কেউ যদি দূঢ় সংকল্পবদ্ধ হয় কিছু করতে তবে কোনো বাধা-বিপত্তির শৃঙ্খল তাকে আটকিয়ে রাখতে পারবে না। কত শত সমস্যা আর প্রতিবন্ধকতা আলিঙ্গন করেছে তাকে কিন্তু তিনি ঝড়ের বেগে অতিক্রম করেছেন ঐসকল সমস্যাগুলোকে। পর্যায়ক্রমে তিনি শেষ করলেন এসএসসি, এইচএসসি এবং বি.এ ।

 

তার থমকে যাওয়া জীবনের গতি ফিরিয়ে আনতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছেন তার শিক্ষক চিত্তরঞ্জন সরকার। তিনিও সিদ্ধান্ত নিলেন শিক্ষকতা পেশা গ্রহন করবেন।একজন ছাত্রের জীবনে একজন শিক্ষকের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। একজন ছাত্রের জীবনের সকল প্রকার সমস্যা আর প্রতিবন্ধকতার বেড়াজাল থেকে মুক্তির পথে প্রদর্শকের দায়িত্ব পালন করে থাকেন একজন শিক্ষক। কিন্তু বর্তমানে প্রকৃত শিক্ষকের সংখ্যা অনেক কম। অধিকাংশ হলেন নেহাত বেতনভোগী কর্মচারী।

 

‘ভূকশিমইল দারুল উলুম দাখিল মাদরাসা’র সহকারি শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও বেশিদিন সেখানে ছিলেন না । প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা শুরু করেন ২০০৪ সাল থেকে । বর্তমানে তিনি লাকমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন।

 

একজন আদর্শ শিক্ষকের যেসকল গুনাবলী থাকা দরকার তাঁর মধ্যে সেগুলো বিদ্যমান। ইতিমধ্যে তিনি তাঁর চমৎকার আর প্রাণোচ্ছল পাঠদান এর কারণে জায়গা করে নিয়েছেন শিক্ষার্থীদের মনিকোঠায়। শিক্ষার্থীদের সকল ধরনের সমস্যার সমাধানে অক্লান্ত কাজ করে যাচ্ছেন মাফিকুল ইসলাম মহোদয়। হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন । তিনি হাওরাঞ্চলের শিক্ষার মান উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর অনেক শিক্ষার্থী সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন পেশায় কর্মরত আছেন এবং অনেক শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন জাতীয় এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত।
উনার নেক হায়াত কামনা করি।

 

▪️ লেখক: রিয়াজ উদ্দিন ,  শিক্ষার্থী,  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ।


এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com