Logo
নোটিশ ::
আপনার যেকোনো সৃজনশীল লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের ঠিকানায়।আমাদের ইমেইল: hello.atharb@gmail.com

উপন্যাস: ডিপ্রেশন ও একটি মৃত্যু — ৪র্থ পর্ব || ফাতেমা আকন পিউ

অঙ্কন ডেস্ক / ৩১৬ বার
আপডেট সময় : বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২০

আমরা বাবার টাকাকে নিজের বলে গরম দেখাই। বলি আমার বাবা অমুক, তমুক। কিন্তু আমরা ভুলে যাই এই সম্পত্তি, আমাদের নয়। বাবা যদি কিছু দিতে না চান তবে কি কেউ ছিনিয়ে নিতে পারে? নিজের পরিচয়ে বাঁচা আর অন্যের পরিচয়ে বেঁচে থাকা এক নয়। নিজের কোনো পরিচয় না থাকলে কেউ আপনাকে নিজের নামে চিনে না। সবাই বলে, “তুমি অমুকের ছেলে না? তোমার বাবা অমুক না? ” এই কথা গুলোতে স্পষ্ট সমাজে আপনার নিজের কোনো পরিচয় নেই। আমাদের উচিত নিজেদের একটা যোগ্য পরিচয় গড়ে তোলা। যতই কোটিপতির সন্তান আমরা হই না কেন! নিজের বলতে কোনো পরিচয় আমরা গড়ে তুলতে পারি না বা জানি না।

কলেজের বন্ধুদের সাথে তেমন মিশে না রাফসান। তার ভয়, যদি সে ভুলে মুখ ফস্কে বাসার ব্যাপারে কিছু বলে দেয়! তখন তো তার পরিবারেরই অপমান। যতই কষ্ট হোক, নিজের পরিবারকে সে ছোট করতে চায় না। যতই হোক তার জন্ম এই পরিবারে। সেই পরিবারের রক্ত তার শরীরে। বাবা মায়ের রক্তে জন্ম তার। কিভাবে পারবে তাদের অপমান করতে? আর কেউ হলে হয়তো এতোদিনে সবাই জেনে যেন রাফসানের সাথে হওয়া অত্যাচার গুলোর কথা। কিন্তু রাফসান সেই কথা তাদের দরজার বাইরে যেতে দেয় না।

সময় চলে তার গতিতে। সঙ্গে চলি আমরাও। দিনের পর দিন এগিয়ে যায় আমাদের চিন্তা ধারা। ফেলে আসি অতীত। কিন্তু পিছু ছাড়েনা আমাদের অভ্যাস গুলো। আমাদের অভ্যাস আমরা বহন করি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। রাফসানের বাবা মা ভাই যতই তাকে ভালোবাসা দেখাক না কেন, তাকে অত্যাচার করা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কথায় আছে কুকুরের লেজ কখনো সোজা হয় না। এখানেও ঠিক তাই। আসরাফ সাহেব বোন ও বোনের স্বামীকে অনেক কথা বললেও রাফসান আজও রাতের অন্ধকারে কাঁদে। ছেলেরা কাঁদতে খুব কম মানুষ দেখেছে। এতো সহজে ছেলেদের চোখে পানি ঝরে না। এটা তাদের জন্মের বৈশিষ্ট্য। সৃষ্টিকর্তা তাদের সেই ক্ষমতা দিয়ে তৈরি করেছেন। তাদের বুকে থাকে পাহাড় সমান কষ্ট, কিন্তু চোখে আসে না বিন্দু মাত্র জল।

এক বছর পর…..

আগামীকাল রাহাতের বিয়ে। একমাত্র ভাইয়ের বিয়ে বলে কথা রাফসান বসে থাকবে তা কি হয়? কোমর বেঁধে লেগেছে রাফসান ভাইয়ের বিয়ের কাজ করতে। ঘর সাজানো থেকে শুরু করে দাওয়াত, রান্না, আয়োজন সব একাই দেখছে রাফসান। আসরাফ সাহেব আছেন রাফসানের সাথে। ছোট মানুষ এতো বড় দায়িত্ব বহন করতে যদি ভুল করে বসে!

রাহাতের বিয়ে তার পছন্দের মেয়ের সাথেই হচ্ছে। মেয়ের নাম মাহা। মাহা আর রাহাত কলেজের বন্ধু। গত চার বছর ধরে তাদের এই বন্ধুত্ব ভালোবাসায় পরিনত হয়। মাহার পরিবার বিশাল বড়লোক। দেশ বিদেশে তাদের ব্যবসা বানিজ্য। চাইলে রাহাতের চাইতে হাজার গুণ ভালো ছেলের কাছে মাহার বিয়ে দিতে পারে। কিন্তু মাহা নিজের পছন্দ করা ছেলেকেই বিয়ে করবে। মাহার বাবাও এতে রাজি। কারণ নিজের পছন্দ করা ছেলের সাথে বিয়ে দিলে যদি মেয়ে সুখি না হয়! নিজের আদরের মেয়ের কষ্ট তিনি দেখতে পারবেন না। মাহার বাবা কানাডা থাকেন। এবং তিনি ঠিক করেন বিয়ের পর রাহাতকে নিজের কাছে নিয়ে নিবেন ব্যবসা দেখাশোনার জন্য। এতে করে উনি কিছুটা বিশ্রাম নিতে পারবেন। মূলত রাফসানের বাবা মা এই কারণেই মাহার সাথে বিয়ের প্রস্তাব মেনে নেন। কেননা যারা স্বার্থপর তারা সব ক্ষেত্রে নিজেদের স্বার্থ খুঁজে বেড়ায়। ছেলের সুখের খোঁজে নয়, বিদেশি টাকার লোভে হচ্ছে রাহাত ও মাহার বিয়ে।

মহা ধুমধামে হয়ে যায় রাহাত আর মাহার বিয়ে। রাজকন্যার মতো পা থেকে মাথা পর্যন্ত স্বর্ণে মুড়িয়ে রাণী হয়ে মাহা আসে রাফসান ভিলায়। যেমন তার রূপ তেমন তার ব্যবহারও। এসেই সবার আগে বন্ধুত্বের হাত বাড়ায় রাফসানের দিকে। দশটা নয় পাঁচটা নয় একটা মাত্র দেবর তার। এই পরিবারের ছোট ছেলে। সেই তো আছে মাহার অবসর সময় কাটিয়ে উঠার একমাত্র সঙ্গী। বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে মাহা। ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছে ছিল তার একটা ছোট ভাই থাকবে। আদর করবে শাসন করবে। নিজে তার পছন্দের খাবার রেধে খাওয়াবে। নিজে পছন্দ করে কাপড় কিনে দিবে। মনে হয় এখন মাহার সেই স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। নতুন পরিবারে মাহা তার মনের মতোই ভাই রূপে দেবর পেয়েছে। যার মধ্যে দেবর নয় একজন ভাইয়ের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।

শ্বশুরবাড়ি আসার পরদিন থেকেই মাহা তার মহিমা শুরু করে। সবার আগে ঘুম থেকে উঠে সবার জন্য নাস্তা বানায়। কিন্তু তখন রাফসান ছাড়া আর কেউ জেগে থাকে না। তার সবার আগে রাফসানকে খাইয়ে কলেজে পাঠিয়ে দেয় মাহা। তবে খালি হাতে নয়, কিছু টাকাও সাথে দিয়ে দেয়। ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে শুরু করে রাফসানের জীবন। রাহাতের বিয়ের পর তার আশ্রয় হয় লিভিং রুমে। কিন্তু মাহা শাহানাজ বেগমের কাছ থেকে বাসার চাবি নিয়ে খুলে নেয় একটা গেস্ট রুম। নিজের হাতে একটা একটা করে জিনিস সাজিয়ে রাখে। রাহাত, শাহানাজ ও তৌকির সাহেব প্রথমে ভেবেছিলেন হয়তো মাহার বাবার বাড়ি থেকে কেউ আসবে। অবশ্য ভাবারই কথা কারণ মাহা আজ অনেক ধরনের রান্না করেছে। মনে মনে তারাও খুশি এই ভেবে যে বিদেশি টাকার খনি তাদের বাড়ির বউ। কিন্তু তাদের সব খুশি মাটি হয়ে গেল যখন দেখলো সেই রুমে রাফসানের কাপড়। রাফসান কলেজ থেকে আসার সাথে সাথে তাকে নতুন কাপড় দিয়ে মাহা গোসল করতে পাঠিয়ে দেয় আর তার ব্যাগ নিয়ে রাখে গেস্ট রুমে। টেবিলে সব খাবার ঢেকে রাখে কিন্তু সেই সব খাবারের ঘ্রাণে সারা ঘর মৌ মৌ করছে।

গোসল থেকে বের হতেই রাফসানকে খাবার টেবিলে নিয়ে বসায় মাহা। একে একে ঢাকনা তুলে খাবারের। চিংড়ি ভুনা, ভুনা খিচুড়ি, রোস্ট, বিরিয়ানি, কাবাব সব রান্না হয়েছে আজ। আর এই সব খাবার রাফসানের প্রিয়। আজ এতো বছর পর নিজের সামনে এতো খাবার দেখে বিশ্বাস হচ্ছে না রাফসানের। একটা নতুন দামী ল্যাপটপ মাহা তার হাতে দিয়ে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানায়। তখন রাফসানের মনে পড়ে আজ তার জন্মদিন। সে তো ভুলেই গিয়েছিল। আর মনেই বা থাকবে কিভাবে! এর আগে কেউ তো মনে করিয়ে বা এতো আয়োজন করে তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানায় নি।

রাফসানকে এভাবে আপ্যায়ন করা দেখে মাহার উপর রেগে উঠে রাহাত। কিন্তু তাকে থামিয়ে দিয়ে মাহার পক্ষেই কথা বলেন শাহানাজ ও তৌকির সাহেব। রাফসানের সাথে এক টেবিলে বসে সবাই খেয়ে নেয়। নতুন করে শুরু হয় রাফসানের জীবনের গল্প। মাহা হয়ে উঠে তার এক মজবুত দেয়াল। যা ধরে এগিয়ে যেতে পারে সামনের দিকে।

 

 

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com