Logo
নোটিশ ::
আপনার যেকোনো সৃজনশীল লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের ঠিকানায়।আমাদের ইমেইল: hello.atharb@gmail.com

গল্প: অবাক চোখের মেয়ে || জুবায়ের হাসান রাব্বি

অঙ্কন ডেস্ক / ২৫৯ বার
আপডেট সময় : রবিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২০

রুপন্তি আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। চোখে মুখে অবাক চাহনি। আমার এমন আচরণে সে যথেষ্ট অবাক হয়েছে। অবাক হওয়ার মতই ব্যাপার। সে ভেবেছিল আমি খাবার মুখে দিয়ে পানি পানি করে চিৎকার করবো। চোখ মুখ ঝালে লাল হয়ে যাবে। মানুষ নেশা করলে চোখ লাল হয়। এই লাল বেশি হয় প্রেমে পরলে। কারন প্রেম একরকম নেশা। প্রথমে শখের বসে মানুষ খায়। এটা কখনো ভাল থাকার অসুখ হয়। আবার কখনো কষ্টের কারণ হয়।

ঝাল লাগলেও চোখ লাল হয়। সাথে জিহ্বাও লাল হয়।
কিন্তু অবাক ব্যাপার! আমার হচ্ছে না। আমি গোগ্রাসে বিরানি গিলছি। রুপন্তি বারবার আমার দিকে অবাক হয়ে তাকাচ্ছে। সব প্রেমিকের কাছেই প্রেমিকার অবাক চোখ ভাল লাগে। ও চোখে মাদকতা থাকে। অদ্ভুত এক ভাল লাগা থাকে। তাই কখনো কখনো প্রমিকাকে অবাক করতে প্রেমিককে অদ্ভুত আচরণ করতে হয়।

-দারুণ রান্না হয়েছে!
আমার কথা শুনে রুপন্তি রেগে গেল। রেগে আগুন হয়ে গিয়েছে। এই আগুনে এক কাপ পানি ধরলে গরম হয়ে যাবে। তারপরে সেই পানি দিয়ে চা বানিয়ে খাওয়া যেতে পারে। বিরানির সাথে চা খাওয়া যায় না। এক্ষেত্রে ঠান্ডা পানীয় হলে ভাল হয়।

-খাও তুমি।
রুপন্তি রেগে উঠে গেল। উঠে গেল কেন! রুপ্লন্তি উঠে যেতেই খাওয়া বন্ধ করে দিলাম। তাকে অবাক করার জন্যই অতিমাত্রায় ঝাল বিরানি গিলছিলাম। খেয়ালটা ঝালের দিকে ছিলো না। রুপন্তির অবাক চোখের দিকে ছিল।
খাওয়ার টেবিল থেকে উঠে বেসিনের সামনে দাঁড়ালাম। আয়নায় নিজেকে দেখে হেসে ফেললাম। ঠোট মুখ সব লাল হয়ে আছে। শুকনা মরিচের মত লাল।

হাতমুখ ধুয়ে কয়েক গ্লাস পানি খেলাম। পেটের ভেতরে যেন একটা ছোটখাটো পানির ট্যাংক বসানো আছে। যেখানে অনেক পানি ধরবে।
পানি খেতে খেতে পেট ফুলিয়ে ফেলেছি।
বেডরুমে ঢুকে বিছানায় বসলাম। রুপন্তি এতক্ষণে বিছানা সাজিয়ে গুছিয়ে ফেলেছে। পরিপাটি বিছানা ছাড়া তার ঘুম আসেনা। আমার যেমন তেমন হলেই হয়। চোখে ঘুম এলে আশেপাশে দেখার সময় থাকেনা। ঘুমানোর মত কোন জায়গা হলেই হয়। মেস লাইফে মশারি ছাড়াই ঘুমিয়ে যেতাম। অনেক রাতে ঘুম ভেঙে আবিষ্কার করতাম, মৌমাছির ঝাকের মত মশা আমার শরীরে মশাচাক বানিয়েছে। রক্ত খেয়ে সাস্থ বাড়িয়ে দিয়েছে।

-আজকে মশা আছে। মশারী টাঙিয়ে দিও।
বিছানায় শুয়ে কাথাটা গায়ের উপর চাপ দিয়ে চোখ বন্ধ করলাম। ঘুমানোর চেষ্টা করছি কিন্তু ধাক্কাধাক্কিতে সেটার ব্যাঘাত ঘটলো। চোখ খুলতেই রুপন্তি বলল
-নামো বিছানা থেকে।
-মানে!
-মানে তুমি এখানে ঘুমাবে না। ওই রুমে গিয়ে ঘুমাও।
-কেন!
-যেতে বলছি যাও।
-কারণটা জানা যাবে!
-জানতে হবে না।

বাধ্য হয়ে বিছানা ছেড়ে উঠলাম। ঘরের বউ এর হুকুম মানতেই হবে। যে যত বড় ক্ষমতাবান লোক হোক না কেন হোম মিনিস্টারের কথা মানতেই হবে। এই হোম মিনিস্টার মানুষের ভোটে নির্বাচিত হয় না। বিয়ে করে ঘরে আনা হয়।

ছোটরুমে এসে শুয়ে পরলাম। এই রুমে কেউ থাকা হয়না। গেস্টদের জন্য এটা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অনেকদিন গেস্ট না আসায় বিছানায় ধুলা জমে গিয়েছে। কোনরকমে বিছানা পরিষ্কার করলাম।
বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই মশারা খবর পেয়ে গেল। তারা জানতে পারলো একজন তাদের জন্য খাবার নিয়ে এই রুমে ঢুকেছে।
তাই তারা খাবার সংগ্রহ করতে ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে আসছে। মশাদের খাবার সংগ্রহ করার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় শোয়া থেকে উঠে বসলাম।
বিছানা থেকে উঠে বেডরুমে এলাম। রুপন্তি চুপচাপ শুয়ে আছে। তার রাগ এখনো কমেনি। রাগ থাকলে মানুষের ঘুম আসেনা।
রুপন্তির পাশে দাঁড়িয়ে বললাম
-ওই রুমে অনেক মশা।
-মেয়েদের সাথে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলার সময় এটা মনে ছিলোনা!

এতক্ষণে তার রাগের আসল কারণ জানতে পারলাম। আজকে সকালে একটা মেয়ের ফোন এসেছিল। আমি বেলকুনিতে গিয়ে অনেক্ষণ ধরে তার সাথে কথা বলেছি। কথা বলার মাঝে বারবার হেসেছি।
রুপন্তি এটা দেখেই রেগে আছে। মেয়েরা নিজের খাবার কারো সাথে শেয়ার করতে পারে। কাউকে পুরো খাবার দিয়ে একবেলা না খেয়েও থাকতে পারে। কিন্তু তাদের স্বামীর ভাগ কাউকে দিতে পারেনা।

বেডরুম থেকে আবার ছোটরুমে এলাম। এখন রুপন্তির রাগ ভাঙানো সম্ভব না। রাগ ভাঙাতে গেলে আরো রাগ বেড়ে যেতে পারে। তারপরে রেগে জিনিস পত্র ভাঙতে পারে।
তার মায়ের মুখে শুনেছি সে আগে রেগে জিনিসপত্র ভাঙতো। কিন্তু বিয়ের পরে সেসব করেনি। আমি একবার তাকে বলেছিলাম
-তুমি এখন আগের মত জিনিসপত্র ভাঙচুর করো না কেন!
-ভাঙলে তো আমার লস। এসব তো আমার সংসারের জিনিস।

বিয়ে মানেই দায়ীত্ব। বিয়ের আগে যে মেয়েটির মধ্যে বাচ্চামি স্বভাব ছিল। সে এখন কত বুদ্ধিমতী। বিয়ের আগে দুজনে ঘুরতে বের হয়ে কোন রেস্টুরেন্টে বসলে তাকে খাইয়ে দিতে হতো। ওয়েটার খাবার রেখে চলে যেতেই রুপন্তি আমার সামনে থেকে আমার পাশে এসে বসতো। আমার দিকে তাকিয়ে বলতো
-খাইয়ে দাও।
-কিন্তু মানুষ কি বলবে!
-প্রেম কি অন্য মানুষের সাথে করো হু।
মুচকি হাসতাম তখন।

বিছানায় শুয়ে এপাশ করছি। ঘুম আসছেনা। প্রতিদিন ঘুমানোর আগে রুপন্তিকে গল্প শুনাতে হয়। কোন রুপকথার গল্প নয়। সারাদিন কি কি করেছি সব গল্প তাকে শুনাতে হয়। সে মনোযোগ দিয়ে আমার বকবকানি শুনতে থাকে।
আজ বকবক করার জন্য মন ছটফট করছে। কিন্তু সেটা পারছিনা।
চুপচাপ চোখ বন্ধ করলাম। চোখ বন্ধ করার আগে নিজেকে মশাদের হাতে সপে দিয়েছি। তাদের যা ইচ্ছা করুক। এছাড়া কোন উপায় ও নেই।

বালিশ নড়াচড়া করতেই ঘুম ভেঙে গেল। কখন যে ঘুমিয়ে গিয়েছি বুঝতে পারিনি। পুরোপুরি ঘুম ভাঙতেই চোখ খুলে তাকালাম। চোখ খুলেই অবাক! প্রথমে ভেবেছিলাম চোর হবে হয়তো। পরে দেখলাম রুপন্তি!
উঠে বসলাম। রুপন্তি বালিশের নিচ থেকে মোবাইল বের করলো। এতক্ষণ ধরে সে এটাই খুঁজছিলো। আমি কিছু বলার আগেই যে মোবাইলের লক খুলতে শুরু করল। মোবাইলের পাসওয়ার্ড তার নামেই দেওয়া। তার লক খুলতে সময় লাগলোনা।
আমি তার এমন কর্মকাণ্ড দেখে বললাম
-কি হয়েছে তোমার! এত রাতে ফোন দিয়ে কি করবে?
-চুপ থাক তুই। সকালবেলা কোন মেয়ের সাথে এত ঢং করে কথা বললি সেটা আমাকে দেখতে হবে তো।
-ফোন দাও।
-চুপ। কোন কথা বলবিনা।
-মোবাইল আমার কাছে দাও। তুমি খুঁজে পাবেনা।
-আমাকে বোকা ভাবিস না। কল হিস্টোরি খুঁজলেই পেয়ে যাবো। কয়টায় কথা বলেছিস আমার ভাল করে মনে আছে।

অনেক্ষণ মোবাইল ঘেটে রুপন্তি কাঙ্ক্ষিত নাম্বার পেল। সেই নাম্বারে কল দিয়ে লাইড স্পিকার দিল।
দুইবার চেষ্টা করেও ফোন রিসিভ করলো না। রুপন্তি রেগে বলল
-আরেকবার কল দিব। রিসিভ না করলে খবর আছে।
-আরে এত রাতে সে কি তোমার ফোন ধরার জন্য বসে আছে নাকি।
-কেন থাকবেনা। অন্যের স্বামীকে ফোন দিয়ে কথা বলতে পারলে, ফোন হাতে অপেক্ষা করবে না কেন।
রুপন্তির এমন মেজাজ দেখে ভয় পেয়ে গেলাম। ফোন রিসিভ না করলে আমার খবর আছে।
এবারে ফোন রিসিভ হল। ওপাশ থেকে বলল
-দুলাভাই, আপু কি এখনো রেগে আছে!
কথা শুনেই রুপন্তি ফোন কেটে দিল। ওপাশের কথা শুনে রুপন্তি চমকে গিয়েছে। ফোনের ওপাশে রুপন্তির ছোট বোন ছিল।
রুপন্তি চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সে এমন কিছু আশা করেনি। তবে সে আমার চালাকি বুঝতে পেরেছে। সকালবেলা ফোনে কথা বলা ছিল পরিকল্পনা মাফিক।

রপন্তির মুখের দিকে তাকালাম। তার চোখে মুখে অভিমান। আমাকে কি বলবে সেটা বুঝতে পারছেনা।
ঘড়ির দিকে তাকালাম। ঘড়িতে প্রায় বারোটা বাজে। রুপন্তি আমার পাশে বসল। রুপন্তির হাতে হাত রাখলাম। এতক্ষণে রাগটা কমেছে। কানের কাছে মুখ এগিয়ে বলললাম
-ছাদে যাবে?
আমার বলতে দেরি হলেও তার উঠতে দেরি হল না। হাত ধরে উঠে দাঁড়াল।

রুপন্তি আমার পাশে বসে আছে। কনকনে শিতের মধ্যে ছাদে বসে থাকা বোকামি। কিন্তু আমরা দুজন সেই বোকামি করছি। মনে প্রেম জাগলে মানুষ একটু বোকা হয়।
দুজনে এক চাদরের নিচে বসে আছি। একে অন্যের শরীরের উষ্ণতা নিচ্ছি।
কালকে হয়তো দুজনেরই ঠান্ডা লাগবে। কিন্তু তাতে কোন আফছোস নেই। দুজনের এমন মধুর প্রণয়ের কাছে ঠান্ডা লাগা তুচ্ছ।


এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com