Logo
নোটিশ ::
আপনার যেকোনো সৃজনশীল লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের ঠিকানায়।আমাদের ইমেইল: hello.atharb@gmail.com

সরকারি চাকরিজীবীদের অর্থপাচার রাষ্ট্রের নিজের পায়ে কুঠারাঘাত : আকিজ মাহমুদ

অঙ্কন ডেস্ক / ১৬৮ বার
আপডেট সময় : বুধবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২০

সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রীর বক্তব্য, “সরকারি চাকরিজীবীদের বিদেশে অধিক পরিমাণে অর্থপাচার” সচেতন নাগরিক মনে আতংক তৈরি করেছে। দেশে সরকারি চাকরিজীবীদের রাষ্ট্র কর্তৃক প্রাপ্ত সুযোগ সুবিধা সাধারণ নাগরিক অপেক্ষা অনেক বেশি। এমন উর্বর ভূমিতে বাস করেও সরকারি চাকরিজীবীদের এরূপ কর্মকাণ্ড মোটেও জনসাধারণের নিকট বোধগাম্য নয়। উপরন্তু এধরনের ক্রিয়াকলাপ রাষ্ট্রকে হলুদ সংকেতই দিচ্ছে বৈকি। উন্নয়নশীল একটি রাষ্ট্রের বিভিন্ন কার্যসাধনকারী এসব কর্মচারীদের বিদেশে অর্থপাচারের ঘটনা মোটেই তুচ্ছ করে দেখার মতো নয়। যদি এসব কার্যক্রমের বিস্তার অতিসত্বর বন্ধ না হয়, তবে রাষ্ট্র এবং জনসাধারণের জন্য অপেক্ষা করছে চরম অমঙ্গল!

অর্থপাচার নিয়ে আলোচনা সমালোচনা দীর্ঘদিনের। প্রত্যেক বছর অঢেল অর্থ দেশ থেকে অবৈধভাবে চলে যায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশগুলোতে। আমেরিকা, কানাডা, সিংগাপুর, মালোয়েশিয়া সহ  আরও বেশ কিছু দেশ এই  অর্থ পাচারকারীদের মূল গন্তব্য বলে জানা যায়। গন্তব্যের তালিকাটা বড় বিধায় ইচ্ছা করলেও সব টাকা ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘ কূটনৈতিক পথে হাটতে হয়। এই বিপুল পরিমান পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা শুধু অনিশ্চিতই নয় বরঞ্চ দিন দিন অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

দেশে ধনির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার  সাথে সাথে বাড়ছে অর্থপাচারকারীদের সংখ্যাও। স্বধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের প্রভাবশালী থেকে শুরু করে বিত্তবান হয়ে ওঠা নেতাদের  বিদেশে অর্থপাচার নিয়ে একচেটিয়া  অপবাদ  দেওয়া হয়ে থাকে।  কিন্তু এরই মধ্যে  তা আয়ত্ত্ব করে নিতে শুরু করেছে ক্রমান্বয়ে বিত্তশালী হয়ে ওঠা সরকারি  কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দও। রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা, যথাযথ ব্যবহার, ক্ষমতার অপপ্রয়োগ না করার  সংকল্প নেওয়া ব্যক্তিরা ওয়াদা ভেঙে  নিজেদের স্বার্থে ক্ষমতা  ব্যবহারের মাধ্যমে ফুলেফেঁপে ওঠার ঘটনা অতি সম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন ঘটনায় প্রমাণিত।

বিদেশে অর্থ পাচারে দেশি বিত্তবানরা এতো হুমড়ি খেয়ে পরলো কেন? উত্তরে, কালেবরে বেরিয়ে আসবে অনেক কিছুই! যার ইতিহাসটা অনেক লম্বা। গত কয়েক বছরে দেশের রাজনৈতিক অবস্থা অনেকটা স্থিতিশীল, পাশাপাশি দেশে অবকাঠামোগত উন্নয়নে যথারীতি বিপ্লব ঘটতে চলছে।  বিনিয়োগকারীদের জন্য তৈরি করা হচ্ছে বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা। তা স্বত্ত্বেও প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়।  সাধারণত দেশের অধিকাংশ বিত্তবান তাদের এবং ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যৎ তাদের পছন্দের দেশগুলোতেই দেখতে পান। কিন্তু নিজেদের ভবিষ্যৎ ভাবনা বাস্তবায়নে যে পন্থা তারা বেছে নিয়েছেন তার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত ক্ষতি করছেন বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর। অবৈধ কালো টাকার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সমাজ, রাষ্ট্র এবং জনসাধারণ। অন্যদিকে বহির্বিশ্বের দেশগুলোতে কালো টাকার মহল গড়ার মাধ্যমে অর্থ পাচারকারীরা এক সময় স্বেচ্ছায় দেশত্যাগ করছে।

এসবের পর মাথায় প্রশ্ন আসে, দেশে টাকা রাখতে সমস্যা কোথায়?

মূলত অনৈতিক পন্থা অবলম্বনে অর্থের প্রাচুর্য গড়া ব্যক্তিরা সরকার এবং জনগণের কাছে তাদের সম্পদকে আড়াল করতে বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচার করে। সবচেয়ে  বড় কারণ হল, সরকার কর্তৃক ধার্য করা কর ফাঁকি দেওয়া। রাজনৈতিক নেতাদের বিদেশে অর্থ প্রেরণ দেশে বরাবরই সমালোচিত। তবে দীর্ঘদিনের এই সংস্কৃতি অনেকটাই এখন সাধারন মানুষের কাছে সাধারণ বিষয়ে পরিণত হচ্ছে। সরকারি চাকরিজীবীদের অর্থ পাচারের খবর যখন বেরিয়ে আসে, তখন জনসাধারণ এমনকি বুদ্ধিজীবী মহলের একাংশেও তেমন ভ্রুক্ষেপ দেখা যায় না।

সরকারি চাকরিজীবীদের মাসিক বেতন এবং তাদের অর্থ পাচারের বিষয়টি সচেতন মহলের চিন্তার বড় কারণ । কেননা এর মাধ্যমে সমাজে চরম বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা দেখা দিতে পারে ভবিষ্যতে। রাষ্টীয় সম্পদের অপব্যবহার, ক্ষমতার অপপ্রয়োগ, নিজেদের প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎসহ জোরজবরদস্তির মত বিষয়গুলো অহরহ ঘটতে পারে।  ঘুষ বৃত্তান্ত তো রয়েছেই। এসব অপকর্ম রাষ্ট্র এবং সরকার উভয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে জনসাধারণ এবং বিশ্বের কাছে।

দেশের বিত্তশালীদের অর্থ পাচারের পরিমান শুনলে  মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। ওয়াশিংটন ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) এর তথ্য মতে, ২০০৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত  বাংলাদেশ থেকে ৬ হাজার ৩০৯ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। টাকার অংকে সংখ্যাটা দাড়ায় ৫ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার বেশি ।  গত সাত বছরে দেশ থেকে পাচার হয়েছে ৫ হাজার ২৭০ কোটি ডলার।  দেশি মুদ্রায় যা সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা, যা ২০১৯- ২০ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের প্রায় সমান!

সুইস ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিগত বছর গুলোতে যেখানে নির্বাচন পূর্ববর্তী বছরে অর্থ পাচার বাড়তো, সেখানে গত কয়েক বছর লাগাতার কেবল তা ক্রমবর্ধমানই। জিএফআই’র তথ্যমতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে দেশ থেকে প্রতি বছর ৭৬৩ কোটি ৩৭ লাখ ডলার পাচার হয়।
উল্লেখিত অর্থপাচার শুধু সরকারি কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারা  হয় নি বরং এর পিছনে বৃহত্তর অবদান রয়েছে বিত্তবানদের।

রাষ্ট্র দাবি করে যোগ্যরাই  রষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ  পদপদবীতে অধিষ্ঠিত হয়। আর এই যোগ্যদের মাপকাঠি হচ্ছে শিক্ষা। যদি শিক্ষিত এই বিশাল শ্রেণী বিশেষত রাষ্ট্রের অনুগত কর্মচারীবৃন্দ রাষ্ট্র বিরোধী কার্য সাধনে লিপ্ত হয়, তাহলে তা রাষ্টের  নিজের পায়ে কুঠাঘাত বৈকি! যা পুরো রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে প্রশ্নের আড়াল করতে পারে না। অতএব অনতিবিলম্বে বিভিন্ন পদে নেতৃত্বাধীন   এবং পদস্থদের (সরকারি চাকরিজীবী) মধ্যে যারা অতিধনী হওয়ার বাসনায়  দেশ, জাতি এবং সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে বিভিন্ন অপকর্মে যুক্ত হয়ে  দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করছে, তাদের বিরুদ্ধে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশীয় সম্পদ বন্টনে যথাযথ ব্যবস্থা এবং দেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে মনোযোগী হতে হবে।

সম্প্রতি আদালত বলেছে, “দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারকারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবে এবং সমস্ত জাতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাবে, এটা হতে পারে না। অবশ্যই তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে।” আর যদি এসব অপরাধীদের আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সম্ভব হয়, তবে তা রাষ্ট্রের জন্য সর্বাধিক মঙ্গলজনক হবে।

এছাড়াও সরকারি চাকরিজীবীদের কাজের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে অবশ্যই। দেশে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে ভরসাসহ অবকাঠামোগত সুবিধা দিলেও বিত্তবানদের দেশ থেকে টাকা পাচার অনেকটা কমে আসবে। দেশ থেকে যারা অন্য দেশে বিনিয়োগ করছে তাদের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে এবং দেশের অর্থ নয়-ছয় করে বিদেশে পাচারকারী রাঘব বোয়ালদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলেই দেশের উন্নয়ন টেকসই হবে।

লেখক: আকিজ মাহমুদ, শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।


এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com