Logo
নোটিশ ::
আপনার যেকোনো সৃজনশীল লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের ঠিকানায়।আমাদের ইমেইল: hello.atharb@gmail.com

উপন্যাস: ডিপ্রেশন ও একটি মৃত্যু —৩য় পর্ব || ফাতেমা আকন পিউ

অঙ্কন ডেস্ক / ৪২৪ বার
আপডেট সময় : শনিবার, ৬ জুন, ২০২০

সারাদিন মামা মামী ও মামাতো ভাইয়ের সাথে কাটিয়ে রাতের খাবার খেয়ে রাফসান নিজের বাসায় যাওয়ার জন্য উঠে। আসরাফ সাহেব তাকে একা ছাড়েন না। নিজেও যান তার সাথে একটা ব্যাগ নিয়ে। তিনি বোনের পরিবারের জন্য কিছু এনেছেন। রাফসানের জন্য সব আলাদা। তাকে আলাদা ভাবেই তিনি নিজের ছেলের মতো সব কিছু দেন।
কলিংবেল চাপে রাফসান। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে রাসফানের বড় ভাই রাহাত। দরজার বাইরে মামাকে দেখে গলা ছেড়ে মাকে ডাকে সে। টেনেটুনে রাফসান ও তার মামার হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে তাদের ভেতরে নিয়ে আসে। শাহানাজ বেগম এসে রাফসানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন এতক্ষণ কোথায় ছিল সে। কত চিন্তা করেছে সবাই। আসরাফ সাহেব বোনকে বলেন যে তিনি নিজের বাসায় নিয়ে গিয়েছিল। সেখানেই ছিল রাফসান।

আসরাফ সাহেবের সামনে তারা রাফসানের সাথে এমন ভাবে ব্যবহার করে যেন দুপুরে কিছুই হয় নি। আসরাফ নিজের আনা জিনিস গুলো রাহাত, শাহানাজ বেগম ও তৌকির সাহেবের মধ্যে দেন, কিন্তু রাহাতের মন ভরে না। তার চোখ থাকে রাফসানের জিনিসের উপর। বাবা মাও ভেতরে ভেতরে ক্ষিপ্ত ছিল রাফসানের জিনিস দেখে। তাই তো মামা চলে যেতেই রাহাত সব কেড়ে নিয়ে নেয়। রাফসান কিছু বলেও না। বলবেই বা কাকে? মামার কাছে নিজের বাবা মা ভাইয়ের বিচার চাইবে সে? নিজের জন্য পরিবারকে ছোট করবে সে?

দিন কেটে যায়। দরজার ওপারে চলে রাফসানের উপর অত্যাচার। কিন্তু দরজার বাইরে এলে সব স্বাভাবিক। তাই যেন রাফসানের মন চায় সে তার পরিবার সারাদিন একসাথে বাইরে সময় কাটাক। যেখানে তাকে তারা ছেলের মতো আদর করে কথা বলে। আর ঘরে একজন চাকরের থেকেও খারাপ সে। তাকে তখন কেউ ভালোবাসে না। অভিনয়, সব অভিনয়। এই দুনিয়ার সবাই অভিনয় নিয়েই আছে। অভিনয় ছাড়া কেউ নেই। দুঃখে থাকলে সুখের অভিনয়। ভালো থাকলে মন্দের অভিনয়। সুস্থ থাকলে অসুস্থ হওয়ার অভিনয়। এক দৃষ্টিতে এই দুনিয়াটা একটা থিয়েটার। আর আমরা এই থিয়েটারে কাজ করা অভিনেতা অভিনেত্রী। যে যত সুন্দর ফুটিয়ে তুলতে পারি চরিত্র সে তত ভালো পুরষ্কার পায় আবার কেউ বা পায় তিরষ্কার।

আজ রাফসানের জন্য একটি বিশেষ দিন। আজ কলেজ জীবনে তার প্রথম দিন। নতুন বন্ধু পাবে সে। জীবনের নতুন একটা অধ্যায়। আসরাফ সাহেব তাকে দামী কলেজেই ভর্তি করিয়েছেন। সে পড়াশোনা করে বড় হবে এটা তিনি চান। শুধু তিনি একা নয়, উনার স্ত্রী সন্তানও তাই চায়। কলেজের প্রথম দিন রাফসান যাওয়ার আগে তার মায়ের কাছে যায়। সব সন্তানই চায় তার প্রথম দিন গুলো স্বরণীয় হোক। সবার মতো রাফসানও তাই চায়। মায়ের কাছে গিয়েছিল ভালোবাসা পেতে। কিন্তু পেল ঝাড়ি সাথে কিছু যন্ত্রণা। রান্নাঘরে গিয়েছিল রাফসান মায়ের কাছে বিদেয় নিতে। হ্যাঁ বিদেয় দিয়েছেন তিনি কড়াইতে থাকা গরম তেলের সাথে। রাফসানের মুখে তিনি গরম তেল ছুঁড়ে মারেন। কিন্তু রাফসান লম্বা হওয়ার সেই তেল তার বুকে এসে পড়ে। কলেজের নতুন শার্ট গরম তেলে পুড়ে যায়। তাও চুপ করে থাকে রাফসান। গরম তেলে তার বুক জ্বলে যায়, কিন্তু বুকের ভেতরের জ্বলাটা কি দেখতে পায় না কেউ? মাঝে মাঝে রাফসান ভাবে কেন তাকে একটু ভালোবাসা দেয় না তারা। কেন তাকে এভাবে তিলে তিলে মরতে হচ্ছে? এতো কষ্ট কেন তাও নিজের বাবা মায়ের কাছে?

সন্ধ্যায় রাফসানের কলেজের কথা জানতে আসরাফ সাহেব আসেন। কলেজের প্রথম দিন কেমন কাটলো তা জানার জন্য। কিন্তু তিনি এসে যা দেখলেন তাতে নিজের মাথা ঠিক রাখতে পারলেন না। শার্টের বোতাম খুলে নিজের রুমে শুয়ে আছে রাফসান। বুকের উপর লাল হয়ে আছে। ফোস্কা হয়ে আছে সেই জায়গায়। চোখ বেয়ে তার পানি বালিশ ভিজিয়ে দিচ্ছে। এসব দেখে তিনি ঠিক বুঝে যান এসব শাহানাজ বেগম করেছেন। তাই তিনি রাফসানের রুম থেকে বেরিয়ে তিনি চিৎকার করে ডাকেন শাহানাজ আর তৌকির সাহেবকে। মামার গলা শুনে শার্টের বোতাম লাগিয়ে বেরিয়ে আসে রাফসানও। ভাইকে এভাবে চেঁচাতে দেখে কিছু আন্দাজ করতে পারেন রাফসানের বাবা মা। রুম থেকে এসে নরম সুরে শাহানাজ বলেন,

” ভাইয়া কি হলো এভাবে ডাকছেন কেন? ”

” কেন ডাকছি? রাফসানের বুক পুড়লো কিভাবে? ”

” ওটা তো ও নিজের ভুলে করেছে। আমি রান্নাঘরে কাজ করছিলাম। আর রাফসানের হাত লেগে কড়াই উল্টে ওর বুকে পড়ে গেল। কতবার বলেছি আমার কাজের সময় রান্নাঘরে না যেতে। কখন কি করে বলা যায় না। আমি তো অনেক খেয়াল করে রাখি। ”

” রাফসানের ভুলে পড়েছে নাকি তুই ফেলেছিস ওর উপর? ”

” ছিঃ ছিঃ আমি আমার ছেলেকে কেন এভাবে কষ্ট দিব? ”

তখনই রাফসান এগিয়ে এসে মামাকে বলে,

” মামা আমার ভুলেই পড়েছে। আর বেশি কিছু তো হয় নি সামান্য হয়েছে। ”

” এটাকে তুই সামান্য বলছিস? চল তুই আমার সাথে। ডাক্তার দেখাতে হবে তোকে। চল। ”

রাফসানকে জোর করেই নিয়ে যান আসরাফ সাহেব। ডাক্তার দেখিয়ে ঔষধ কিনে নিয়ে তাকে বাসায় পাঠিয়ে দেন তিনি। সেদিনের ঘটনার পর রাফসানের উপর হওয়া অত্যাচার কিছুটা কমে আসে। কিন্তু তার পড়াশোনার বিষয়ে আগের মতোই থাকে। পরীক্ষার সময় বাবা টিভি এতো সাউন্ড দিয়ে চালান যে সে পড়তেই পারে না। মা এসে বই খাতা ছিঁড়ে ফেলেন। রুমে এসি বাড়িয়ে তার নোট খাতা ছিঁড়ে আগুন ধরিয়ে শরীর গরম করে রাহাত। কলেজে না আসতে দিয়ে তাকে কাজে ছাদে পাঠিয়ে দেন বাবা। মিস্ত্রীদের কাজ বুঝিয়ে দিয়ে পানির পাইব বেয়ে পাঁচ তলা থেকে পালিয়ে খালি পায়ে কলেজে এসে ক্লাস করা ছেলে হলো রাফসান। যার আছে লাখ লাখ টাকার সম্পত্তি। আছে অনেক নাম। কিন্তু সে সব পরিবারের। নিজের নয়।


এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com