Logo
নোটিশ ::
আপনার যেকোনো সৃজনশীল লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের ঠিকানায়।আমাদের ইমেইল: hello.atharb@gmail.com

আমাদের সংবিধানের সৌন্দর্য || মো. রনি ইসলাম

অঙ্কন ডেস্ক / ১৯০ বার
আপডেট সময় : বুধবার, ১১ নভেম্বর, ২০২০

 

সংবিধান একটি রাষ্ট্রের দর্পণ স্বরূপ। সচেতনতার সাথে দর্পণ দেখলে যেমন একটি মানুষের আকার আকৃতি, হালনাগাদ পরিবেশ পরিস্থিতি বোঝা যায় তেমনি একটি রাষ্ট্রের আশা আকাঙ্ক্ষা, উদ্দেশ্যসহ গঠন ও কার্যাবলীর বিভিন্ন দিক সম্পর্কে সহজে অবগত হওয়া যায়। নাগরিক ও বহির্বিশ্বের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক, রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রশাসনের গঠন ও প্রশাসনগত দায়দায়িত্ব, জীবন পরিচালনায় জনগণের নাগরিক অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্যের সুস্পষ্ট বিষদ উল্লেখ থাকে সংবিধানে। এজন্য গ্রিক দার্শনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এরিস্টটল সংবিধানকে রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত জীবন প্রণালি বলেছেন।

 

 

জাতি হিসেবে আমরা অত্যন্ত সৌভাগ্যবান।মাত্র ১০ মাসে তৎকালীন বঙ্গবন্ধু সরকার জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষা সম্বলিত একটি সংবিধান উপহার দিতে সক্ষম হয়েছিলেন, যেখানে আমাদের প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান সময় নিয়েছিল প্রায় ৯ বছর (১৯৪৭- ৫৬) এবং ভারত নিয়েছিল ৩ বছর (১৯৪৭- ৪৯)। ১৯৭২ সালের ৮ ই জানুয়ারি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১০ ই জানুয়ারি দেশে ফিরে ২৩ শে মার্চ ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ’ জারি করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭০ সালের জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে ৪০৩ সদস্যের সমন্বয়ে একটি গণপরিষদ গঠন করা হয়। ১০ই এপ্রিল ১৯৭১ সালের ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ অনুযায়ী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় রাষ্ট্রপতি পরের বছরের একই তারিখে গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেন এবং গণপরিষদ কর্তৃক শাহ আব্দুল হামিদ ও মোহাম্মদ উল্লাহ যথাক্রমে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন। ১১ই এপ্রিল ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি করে ৩৪ সদস্য বিশিষ্ট খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠিত হয়। ১৭ ই এপ্রিল প্রথম বৈঠকে খসড়া কমিটি জনমতের আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেন। এরপর ১০ ই জুন কমিটি প্রাথমিক খসড়া প্রণয়ন করেন। খসড়া কমিটির সভাপতি ড. কামাল হোসেন ভারত, যুক্তরাজ্য ঘুরে আসার পর ১১ই অক্টোবর খসড়া কমিটির শেষ বৈঠকে অভিজ্ঞতা সম্বলিত খসড়া সংবিধানটি চূড়ান্ত রূপে গৃহীত হয়। পরের দিন অর্থাৎ ১২ই অক্টোবর গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনে ড. কামাল হোসেন খসড়া সংবিধানটি বিল আকারে গণপরিষদে উত্থাপন করেন। ৩ টি পাঠের মধ্য দিয়ে ৪ ই নভেম্বর খসড়া সংবিধানটি গণপরিষদ কর্তৃক বাংলাদেশের সংবিধান হিসেবে পাস এবং চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়।

 

 

 

আদর্শ সংবিধানের সংজ্ঞা ব্যাপক এবং জটিল। কিন্তু যে মৌলিক উপাদানগুলো থাকলে একটি সংবিধানকে আদর্শের মানদণ্ডে তুলনা করা যায় সেই উপদানগুলো আমাদের সংবিধানে রয়েছে। আমাদের সংবিধানের মোট অনুচ্ছেদ সংখ্যা ১৫৩ টি এবং এই ১৫৩ টি অনুচ্ছেদ স্বতন্ত্র নাম নিয়ে ১১টি অধ্যায়ে বিভক্ত। এর একটি প্রস্তাবনাসহ ৭টি তফসিল রয়েছে। প্রারম্ভিক শুরু হয়েছে সংবিধানের দর্শন খ্যাত প্রস্তাবনায় জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এই ৪ টি মূলনীতি উল্লেখের মধ্য দিয়ে। এতে রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট করা হয়েছে।

 

প্রথম ভাগের ১ নং অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের স্বীকৃতি, ২ নং অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের সীমানা এবং ৭ নং অনুচ্ছেদে সংবিধান ও জনগণের ক্ষমতা নিশ্চিত করা হয়েছে। দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে প্রস্তাবনার মূলনীতিকে সুস্পষ্টকরণ (অনুচ্ছেদ ৯- ১২), নাগরিক অধিকার, কর্তব্য এবং উন্নয়নমুখী (অনুচ্ছেদ ১৬, ১৭, ১৮, ১৮ ক) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে জনকল্যাণকামী সংবিধানে পরিণত হয়েছে। নাগরিক ও সরকারি কর্মচারীদের কর্তব্য (২১) ও উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি (২৩ ক) ধারণ বাহনের নিশ্চয়তা সংবিধানকে বেগবান করেছে। সংবিধানের অভিভাবক হচ্ছে বিচার বিভাগ। অনুচ্ছেদ ৭, ৭ ক, ৭ খ পূর্ণমাত্রায় বজায় রাখার জন্য বিচার বিভাগ দায়ী। আর এজন্য প্রয়োজন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা যা নির্বাহী বিভাগ হতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণে ( ২২) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এবং অনুচ্ছেদ- ২৫ বাংলাদেশকে একটি শান্তিকামী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। যা আমাদের গর্বের ও অনুসরণীয়।

 

 

আমাদের সংবিধানকে সবচেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে সংবিধানের ৩য় বিভাগ (২৬- ৪৭)। মানবাধিকারের সার্বজনীন ২৫টি অধিকারের মধ্যে ১৮ টি (২৭ -৪৪) এখানে গৃহীত হয়েছে। যেমন আইনের দৃষ্টিতে সমান (২৭) ধর্ম প্রভৃতি কারণে বৈষম্য (২৮), সরকারি নিয়োগলাভের সুযোগের সমতা (২৯), জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার রক্ষণ (৩২), গ্রেপ্তার ও আটক সম্পর্কে রক্ষাকবচ (৩৩), বিচার ও দণ্ড সম্পর্কে রক্ষণ, চলাফেরার স্বাধীনতা (৩৬), সমাবেশের স্বাধীনতা (৩৭), সংগঠনের স্বাধীনতা (৩৮), চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক স্বাধীনতা (৩৯), প্রভৃতি। উক্ত বিভাগে উল্লিখিত মৌলিক অধিকারগুলো বলবৎ করা হয়েছে অনুচ্ছেদ ৪৪ দ্বারা যেখানে ১০২ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রিট পিটিশনের মাধ্যমে নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। অর্থাৎ মৌলিক অধিকারের গুরুত্ব সংবিধানকে অনন্যতা দান করেছে। এছাড়াও পরবর্তী অধ্যায়গুলো যেমন ৪র্থ ভাগ নির্বাহী বিভাগ তথা সরকারের গঠন কাঠামো, ৫ম ভাগ আইনসভা তথা দেশের জনগণের প্রয়োজনে আইন তৈরি, ৬ষ্ঠ ভাগ বিচার বিভাগ তথা জনগণের সুবিচার নিশ্চিতকরণ, ৭ম ভাগ নির্বাচন তথা নির্বাচন কমিশনের মধ্যমে গণতন্ত্র রক্ষণ এবং ১০ম ভাগে সংবিধান সংশোধনের অনুকূলে অনুচ্ছেদ (১৪২) এনে সংবিধানের প্রগতি, নমনীয়তা ও সুষম প্রকৃতি রক্ষা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে লিখিত ও দুষ্পরিবর্তনীয় সংবিধানের অন্যতম দূর্বলতা থেকে যথেষ্ট বেরিয়ে আসা হয়েছে।

 

 

সংবিধান জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সেই প্রতিফলন মূর্ত হয়ে উঠে। নচেৎ সময়ের সাথে সাথে সংবিধান তার আদর্শের রূপ জৌলুস হারায়। ৭২ এর সংবিধান ছিল জনগণের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সংবিধান। কারণ তখন জনগণ বিরোধী শক্তিকে তোয়াক্কা না করে নির্দ্বিধায় মেনে নেয়। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় বর্তমান প্রশ্নবিদ্ধ। প্রশ্নবিদ্ধ গণতন্ত্রের প্রশ্নে, মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে, বিভিন্ন ভাগে বর্ণিত সাংবিধানিক সংস্থার দায়-দায়িত্বের প্রশ্নে। অর্থাৎ জনগণ সংবিধানের ক্ষমতার ( Supremacy) বিষয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ছে। এছাড়াও কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে। রয়েছে কিছু পরস্পর বিরোধী অনুচ্ছেদ। যেমন অনুচ্ছেদ ৭০ এ সাংসদের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়। ৭৭ নং অনুচ্ছেদ তথা ন্যায়পাল অদ্যাবধি অব্যবহিত। অহেতুক সংবিধান সংশোধন করাও সংবিধানের ঐশ্বর্য নষ্ট করে। জ্ঞাতার্থে, এ পর্যন্ত সংবিধান ১৭ বার সংশোধিত হয়েছে এবং ৪টি (৫, ৭, ১৩, ১৬) সংশোধনী উচ্চ আদালত কর্তৃক অবৈধ ঘোষিত হয়েছে।

 

 

সব কিছু মিলিয়ে সদ্য স্বাধীন হওয়া একটি রাষ্ট্রের সরকার আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ সমাধান সংবিধান উপহার দিয়েছিলেন। ৪ ই নভেম্বর ১৯৭২ বিপুল আনন্দ হর্ষ আর গণকরতালির মধ্যে দিয়ে গণপরিষদে গৃহীত হয় এবং ১৬ ই ডিসেম্বর ১৯৭২ মহান বিজয় দিবস হতে কার্যকর হয়। সেই সংবিধানের জৌলুস অটুট রাখা আমাদের পবিত্র কর্তব্য, নৈতিক দায়িত্ব। জাতির জনক প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিলেন, “এ সংবিধান শহিদের রক্তে লিখিত, এ সংবিধান সমগ্র জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে।”

 

  • লেখক: মো. রনি ইসলাম, শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।


এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com