Logo
নোটিশ ::
আপনার যেকোনো সৃজনশীল লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের ঠিকানায়।আমাদের ইমেইল: hello.atharb@gmail.com

কল্পনায় সুনামগঞ্জ: পঞ্চাশ বছর পর

অঙ্কন ডেস্ক / ৩৩০ বার
আপডেট সময় : রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২০

 

 

অনেক দিন পর গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি। খুব সম্ভবত, ২০৬০ সালের মার্চের দিকে শেষবার গিয়েছিলাম। এখন ২০৭২ সাল,প্রায় ১ যুগ পর গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি। ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে সোজা সুনামগঞ্জ বিমানবন্দরে এসে নামলাম। বিমানবন্দরের ভেতরের পরিবেশটা খুবই মনোরম, নিয়ম শৃঙ্খলা আর সৌন্দর্যের কারনে ইতোমধ্যেই সারাদেশে অত্যাধুনিক বিমানবন্দর হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে। বিমানবন্দর থেকে বের হচ্ছি হঠাৎ দেখা হয়ে গেল বিমানবন্দরের প্রধান অফিসার আমার কলেজ বন্ধু সাইদুল ইসলামের সাথে । আমরা দুজনেই সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের ২০১৮ সালের ব্যাচের শিক্ষার্থী।

 

 

আমরা যখন কলেজে পড়ি তখন কলেজে অবকাঠামোগত সমস্যা, শিক্ষক স্বল্পতাসহ নানান সমস্যায় জর্জরিত ছিল। কিন্তু কলেজের শতবর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যেন সকল সমস্যা ধুয়ে মুছে চলে গেছে। শুনেছি এখন নাকি কলেজের অধিকাংশ কার্যক্রম অনলাইনে সংঘটিত হয়। আমাদের সময়ে হোস্টেলের যে সমস্যা ছিল সেটিও এখন নেই। শিক্ষার্থীদের জন্য বিশাল বিশাল ৬ টি হোস্টেল,ই-লাইব্রেরি এবং অত্যাধুনিক কম্পিউটার ল্যাবসহ প্রয়োজনীয় সবকিছুই রয়েছে। অনেকটা স্বয়ংসম্পূর্ণ কলেজেই বলা চলে।

 

যাইহোক, বিমানবন্দর থেকে গাড়ি করে বাড়িতে যাচ্ছি,আব্দুর জহুর সেতু পার হওয়ার পরেই অনেক আগের একটা গল্প মনেপরে গেলো। সালটা ছিল ২০২০,আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২য় বর্ষে পড়ি, করোনার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় চাচার অপারেশন করানোর দায়িত্বটা আমার কাঁধেই পড়ে। সিলেট থেকে অপারেশন করিয়ে চাচাকে নিয়ে সুনামগঞ্জ আসলাম। সুনামগঞ্জ থেকে কোন ড্রাইভার তাহিরপুর যেতে রাজি হচ্ছিল না। তারা বলছিল যে,  রাস্তার যে অবস্থা, সুস্থ মানুষেই অসুস্থ হয়ে পড়ে, এই রাস্তা দিয়ে অপারেশনের রুগী নিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।
কিন্তু এখন আর সেই দুর্ভোগ পোহাতে হয় না মানুষের। রাস্তার মসৃণতা, প্রশস্ততা সব মিলিয়ে সত্যিই অনেক মনোমুগ্ধকর। তখনকার সময়ে, রাস্তায় বের হলেই যেমন কাপড়ে ধুলাবালির স্তুপ জমে যেত এখন সেটিও নেই।

 

 

বাড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেলো। অনেকদিন পর গ্রামে গেলাম খুব ভালোই লাগছে। গ্রামের মানুষের মুখে কি সুখের হাসি আর হাসি থাকবেই না বা কেনো। গ্রামের মানুষ এখন সহজেই কৃষি কাজ করতে পারছে। ফসল রোপন বা ফসল কর্তন সবকিছুই এখন যান্ত্রিক উপায়ে করা হয়। একদিকে উৎপাদন খরচ অনেক কম অন্যদিকে ফসলের উৎপাদন হয় দিগুণ।
সকালে হাটতে বের হলাম মাটিওয়ান হাওরের পাড়ে। হাটতে হাটতে মনেপরে গেলো সেই ট্রাজেডির কথা। ২০১৬ কিংবা ২০১৭ সালের দিকে মাটিওয়ান হাওরসহ সুনামগঞ্জের প্রায় সবগুলো হাওর আগাম বন্যায় ডুবে গিয়েছিল। মানুষের কি কান্না! কী আহাজারি! তবে সরকার কর্তৃক দেওয়া চাল আর টাকা পেয়ে সে যাত্রায় কোনরকমে বেঁচে গিয়েছিল সুনামগঞ্জবাসী। প্রায়ই হাওর ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটতো। অনেকেই অভিযোগ করতেন পানি উন্নয়ন বোর্ড আর রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ নামেমাত্র বেড়িবাঁধগুলোতে কাজ করে টাকাগুলো নিজেদের পকেটে ভরতেন। তবে সেই ট্রাজেডির পরের বছরই জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পান আব্দুল আহাদ মহোদয়। তিনি রাত দিন অক্লান্ত শ্রম দিয়ে হাওরগুলোকে আগাম বন্যায় ডুবে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। সেবার তিনি দেশের শ্রেষ্ঠ জেলা প্রশাসকও নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে হাওর ডুবে যাওয়ার ঘটনা খুব একটা শুনা যায় নি। তখনকার সময়ে হাওর ডুবে যাওয়ার আশঙ্কায় কৃষকদের মুখে যে মলিন ছাপ পড়তো সেটির অস্তিত্বও এখন নেই কারণ এখন বেড়িবাঁধগুলো অত্যাধুনিক ভাবে দেওয়া হয়েছে।

 

 

হাটা শেষ করে দশটা এগারোটার দিকে বাড়ির দিকে ফিরছি, দেখলাম ১০/১২ টা মাইক্রো যাচ্ছে। ভাবলাম হয়তো বিয়ে বাড়িতে যাচ্ছে কিন্তু পরে জানতে পারলাম মালেশিয়া থেকে পর্যটকের একটি দল তাহিরপুরে ঘুরতে আসছে।

 

 

বাসায় এসে খবরের কাগজ হাতে নিতেই একটা খবর চোখে পড়লো। সুনামগঞ্জে ২০ হাজার কোটি টাকার নদী খনন প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষের দিকে। ভারী বৃষ্টিপাত হলেই সবকিছু পানির নিচে ডুবে যেত। অনেকেই বলতেন ইহা জলাবদ্ধতা আবার অনেকেই বলতেন ইহা আগাম বন্যা কিন্তু কেউ এই সমস্যা নিরসনে বড় কোন পদক্ষেপ নেন নি । প্রকৃতপক্ষে ইহাকে জলাবদ্ধতা বলাই বেশি যুক্তিযুক্ত কারন নদীগুলোর নাব্যতা খুব বেশি হ্রাস পেয়ে গিয়েছিল যার ফলে ভারী বৃষ্টিপাত হলেই বন্যার অবস্থা তৈরি হতো। অবশেষে সুনামগঞ্জবাসী মুক্তি পেতে যাচ্ছে এই সমস্যা থেকে।

 

 

কয়েকদিন পরে গেলাম সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবর্ণ জয়ন্তী অনুষ্ঠানে। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আমার কলেজ জীবনের শিক্ষক জাতীয় অধ্যাপক আবদুল হাই স্যার। এতো অল্প সময়ে দেশের প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় স্থান করে নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।
সমাবর্তন শেষে সার্কিট হাউজে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে চলে গেলাম সুনামগঞ্জ ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ আর আর্জেন্টিনার ফুটবল ম্যাচটি দেখার জন্য। খেলাটি ১-১ গোলে ড্র হয়েছিল।

 

সুনামগঞ্জ জেলায় সাক্ষরতার হার শতভাগ হওয়ার কারণে বাংলাদেশ স্বাধীনতার শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে সুনামগঞ্জ জেলাকে শ্রেষ্ঠ জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

  • রিয়াজ উদ্দিন, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 


এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com