Logo
নোটিশ ::
আপনার যেকোনো সৃজনশীল লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের ঠিকানায়।আমাদের ইমেইল: hello.atharb@gmail.com

গল্প: অতৃপ্তের নিশিডাক || রশ্মি ভট্টাচার্য্য

অঙ্কন ডেস্ক / ৩৫৪ বার
আপডেট সময় : মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২০

সন্ধ্যা নামার বেশ খানিকটা আগেই পূব আকাশটা হঠাৎই যেন কালচে হয়ে এল। ব্রতীদের ঘরে আজ বড়ই লোকজনের কোলাহল, কাল সারা রাতটা নিদ্রাহীন ভাবেই কেটেছে, এই বলে পৃথা নিজের দোতলায় শোবার ঘরে কিয়ৎক্ষণ বিশ্রাম নিতে গেল। গতকাল রাতে তাদের বাড়িতে এক দুর্ঘটনা ঘটে গেছে যে। পৃথার অল্প বয়সী এক কাকিমা ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গতকাল রাত ২: ৩৫ নাগাদ গত হয়েছেন। ৩/ ৪ দিন আগে থেকেই জ্বর ও সাথে অসহনীয় মাথা ব্যথা শুরু হয়, বমি ভাবও কিছু কম ছিল না। খুব চাপা স্বভাবের মানুষ হওয়ায় কাউকে নিজের দুঃখ কষ্ট তেমন ভাবে প্রকাশ করতেন না তিনি। কিন্তু রোগ ভোগের যন্ত্রণা গোপন করা কি অতই সহজ?

ম্যালেরিয়া টেস্টের রিপোর্ট পজিটিভ আসায় ডাক্তার বাবু আশ্বাস দিয়েছিলেন ওষুধে ঠিক হয়ে যাবে, ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। কিন্তু গতকাল রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট দেখে ডাক্তার বাবুর চক্ষু ছানাবড়া হয়ে যায়। হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ মাত্র ৫. ৩০ গ্রাম/ডেসিলিটার ওনার রক্তে। ল্যারিয়াগোর মতো কড়া ওষুধ সহ্য করতে পারলে হয়, এই বলে ডাক্তার রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে কিছুটা চিন্তান্বিত দৃষ্টিতে ব্রতীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। শেষমেশ কাকি মণিকে হাসপাতালে ভর্তি করে রক্ত দেওয়ার কথা স্থির করা হলো। ডাক্তার বাবু প্রেসকিসশনে “Admit” লিখে চলে গেলেন। কিন্তু কাকি মণির হাসপাতালে বড়ই ভয় যে। তাকে অনেক বুঝিয়েও শেষ রক্ষা হল না। তিনি জেদ করে তার সেই কোনার ঘরটা আগলে পড়ে রইলেন। তার দেখ ভালের দায়িত্ব দেওয়া হয় একজন পেশাদার নার্সকে দিন দু’ য়েক আগে। ল্যারিওগোর প্রথম ডোসটি সহ্য করে নিলেও দ্বিতীয়টি আর পারলেন না তিনি। অতি স্বল্প হিমোগ্লোবিনের কারণে লোহিত রক্তকণিকার অক্সিজেন বহন ক্ষমতা হ্রাস প্রাপ্ত হয় ও তিনি হার্ট ফেল করে মারা যান।

সেদিন শ্রাবণ মাসের সংক্রান্তিতে ছাদে প্রতিষ্ঠা করা ভোলা মহেশ্বরের মাথায় জল ঢেলে তিনি খুব করে প্রার্থনা করেছিলেন, যেন তার শারীরিক কষ্ট কমে যায়। খুবই শিবভক্ত ছিলেন কাকি মণি। যাই হোক, ব্রতীর মামারা খবর পেয়ে ইতোমধ্যে তাদের বসত বাড়িতে হাজির হন। সধবা মানুষ মারা গেছেন, তাই বাড়ির সকল সধবারা লাল পেড়ে সাদা শাড়ি ও সিঁদুর আলতাতে কাকি মণিকে সুন্দর করে সাজালেন। ফুল পিসি তুলির টানে কপাল জুড়ে চন্দন এঁকে দিলেন। বেলা দ্বিপ্রহরে শববাহী গাড়ি এসে পৌঁছেল বাড়ির গেটের গোড়ায়। বল হরি রব আওরাতে আওরাতে কাকিমণিকে শ্মশান পথে চির বিদায় জানাল সবাই। সকলের মন ভারাক্রান্ত। কেউ মুখে তেমন ভাবে অন্ন তোলেনি সারাদিন যাবৎ। দু’ দিন আগেও যে মানুষটি সকলের সাথে হাসিমুখে আড্ডা দিত, তার জমকালো কানপাশা জোড়া , তার ব্যবহৃত সুগন্ধি , সন্ধ্যা বেলা উঠানে বসে লাল ফিতা দিয়ে লম্বা বেণী বাঁধা তার হাসিমুখটি আর কখনো দেখা যাবে না। ভাবাই যায় না, মহাকালের লীলাক্ষেত্রে ভস্মীভূত এক তাল ছাইতে পরিণত হয়েছেন তিনি ! সত্যিই! নিয়তির ডাক কে এড়াতে পারে?

ব্রতীর স্ত্রী পর্ণা শ্মশান যাত্রীদের মিষ্টি খাইয়ে বাড়ির সকলের জন্য অল্প খাবারের তোরজোড় করতে লাগল। সন্ধ্যা গড়িয়ে তখন আটটা বেজেছে সবেমাত্র, রান্না ঘরের আলোটা হঠাৎ কেটে গেল। তড়িঘড়ি পর্ণা রান্নাঘর থেকে একটু ভয় পেয়েই নীচে নামল। ঘরেই কেরোসিন তেলের স্টোভে তাকে রান্না সারতে হল। ব্রতীরা অনেকটাই রাত করে ঘুমায়। তাছাড়া আজ বাড়ির সকলেই শোকস্তব্ধ। কারোরই ঘুম নেই চোখে। পৃথা তার মায়ের সাথে দোতলার ঘরে ঘুমাতে গেল, রাত তখন প্রায় ১১: ৩০ টা। কাকি মণি জীবিতকালে সংসারের সব দৈনিক কাজ সেরে রাত ১২: ৩০ টায় দোতলার ঘরে ঘুমাতে আসতো। কাকা মণি ততক্ষণে গভীর নিদ্রায় মগ্ন হয়ে যায়। পৃথার চোখটা সবে লেগেছিল, কিন্তু আচমকা পায়ের খসখসানি আওয়াজে তার তন্দ্রাচ্ছন্নতা সম্পূর্ণ কেটে গেল। সে বিছানার উপর উঠে বসে তার মা’ কে ডাকতে থাকল, রাত তখন ঠিক ১২: ৩৫ । ভয় পেয়েছে খুব। গলা শুকিয়ে গেছে তার, চোখেমুখে ঘাম, তারপর সারাদিনের মানসিক টানাপোড়েন। মা’ কে অনেকবার ডাকায়, তিনি বিরক্ত হয়ে তাকে দু’ কথা শুনিয়ে আবার শুয়ে পড়লেন। পৃথা ঠায় বসেই রইল। পায়ের খসখস আওয়াজটা রোজ ১২:৩০ টা নাগাদই হতো কি না, কাকি মণি কাজ সেরে তখন শোবার ঘরে আসতো যে। ও নিজের মা বাবাকে পরের দিন সকালে উঠে অনেক করে বোঝাবার চেষ্টা করে বারবারই ব্যর্থ হল। কেবল মাত্র দিদি বীথি ওর কথা বিশ্বাস করল। কিন্তু দিদির এই বিশ্বাস কাল হয়ে আঘাত হানতে উদ্যত হল তার ২ বছরের সন্তানের উপর। কাকি মণি বীথির লাবণ্য প্রভা কন্যাটিকে খুব ভালোবাসতেন।
আদর করে তাকে গুল্টু বলে ডাকে সবাই। কাকি মণি মারা যাওয়ার দুদিনের মধ্যেই গুল্টু সোনার ধুম জ্বর এল আর একদিন রাতে জ্বর গায়ে ঘুমের মধ্যেই সে দু’ হাত বাড়িয়ে দরজার দিকে হাঁটতে থাকল। বীথির ঘরে বক্স খাটটি বেশ উঁচু। সেই উঁচু বিছানার গা বেয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে যখন একেবারে খাটের প্রান্তে পৌঁছল, তখন হঠাৎই বীথি চোখ খুলল। কথায় আছে না, রাখে হরি মারে কে। বীথি তৎক্ষণাৎ লাফিয়ে উঠে মেয়ের হাত দুটো চেপে ধরলো। আর এক পা এগোলেই গুল্টু আর প্রাণে বাঁচতো না হয় তো। ঘটনাটি সারা বাড়িতে শোরগোল ফেলে দিলো। এদিকে রাতের পর রাত অনিদ্রার শিকার হয়ে পৃথার চোখের তলা কালি পড়ে গেল। কিন্তু, তার কথা তার নিজের লোকেরাই বিশ্বাস করতে চাইল না। এভাবেই দেখতে দেখতে অশৌচ কেটে মৎসমুখীর দিন উপস্থিত হল। বাড়িতে অনেক লোকের সমাগম সেদিন। পৃথাও স্থির করল,  ভয়কে জয় করতে হবে তাকে। তুলসীর মালা ও একটি গীতা নিয়ে সে নিজের ঘরে শুতে গেল রাতে। গীতার কিছু শ্লোক আওড়াতে আওড়াতেই কখন যেন সে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল।

ঠিক রাত ২: ৩০ টা নাগাদ হঠাৎ ঘুম ভেঙে কাদের যেন কথোপকথন শুনে ও উঠে পড়ল। কোন এক পুরুষ মানুষ জিজ্ঞাসা করছে “তুমি কেমন আছো?” খুবই কর্কশ গলায় এক মহিলা উত্তর দিচ্ছে, “আমি বেশ ভালোই আছি এখানে, তবে আমার সাথে কেউ গেলে ভালো হতো”! এই শুনে পৃথার হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেল, হৃদপিণ্ডটাও না এই বুঝি স্থির হয়ে যায়। সে তৎক্ষণাৎ চেঁচিয়ে তার বাবা ও মা কে ঘুম থেকে তুলে এরূপ অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করতে লাগল। কিন্তু, সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল। কেউ তার কথা বিশ্বাস করল না। এদিকে সারা ঘর ধূপের গন্ধে মো মো করছে।

ঘড়িতে তখন ঠিক রাত ৩ টা। পৃথার মা ভীষণ হুমকি দিয়ে কাকে যেন একটা ধমকাচ্ছে ঘুমের মধ্যেই । পৃথা তখনও ঠায় জেগে । হঠাৎ পৃথার মা কাঁদতে কাঁদতে ঘুম থেকে উঠে পৃথাকে জড়িয়ে ধরলো। তিনি দেখেছেন, খোলা চুলে রক্ত চক্ষু বার করে তাঁর কাকি মণি পৃথার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে তির্যক হাসি হাসছে। তার মা বলে উঠলো, “তুই যাবি! এক্ষুণি দূর হয়ে যা এখান থেকে। ১৩ দিন হয়ে গেল, আমার মেয়েটার ঘুম তুই কেড়ে নিয়েছিস, অসুস্থ হয়ে পড়াশোনারও ক্ষতি হচ্ছে ওর, এবার তুই না গেলে তোকে শায়েস্তা করার জন্য অন্য রাস্তা বেছে নিতে হবে।” এই বলা মাত্র ধীরে ধীরে ধূপের গন্ধ মিলিয়ে গেল।

পৃথার মনে পড়লো পাঁজি দেখে সন্ধ্যায় কাকা মণি বলেছিলেন কাকি মণি নাকি তিন পো দোষ পেয়েছেন, যা কি না খুবই অশুভ সংসারের পক্ষে। বারোটি শিব মন্দির সম্পন্ন ঠাকুর দালান অথবা গঙ্গার পাড়ে তিন মাসের মধ্যে কঠিন প্রক্রিয়ায় যাগযজ্ঞ দ্বারা এই দোষ কাটাতে হয়। পুরোহিতের সাথে পরামর্শ করে তারা দ্রুত ওই দোষ কাটাবার উদ্যোগ নিল।


এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com