Logo
নোটিশ ::
আপনার যেকোনো সৃজনশীল লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের ঠিকানায়।আমাদের ইমেইল: hello.atharb@gmail.com

আরিফা আফরিন’র গল্প “পুষ্পাদি”

অঙ্কন ডেস্ক / ১৪৪ বার
আপডেট সময় : বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২০

গত রাতে ঝড়ে যে আমগুলো পড়েছিল সেগুলো ভোর বেলা ঘুম থেকেই উঠেই কুড়িয়ে নিলাম। একটা পুরোনো মাটির পাত্রে রেখে আলমারির পাশে লুকিয়ে রাখলাম। মধ্যের ঘরে উঁকি মেরে দেখি মা নাই। বাইরে সুখলা মেও মেও করছিলো,গিয়ে দেখলাম মা মাছ কাটছে। মাছের ঘ্রানে সুখলাকে দূরে সরানো গেলো না। আমাকে দেখেই মা বললো,” নাস্তা রাখা আছে, খেয়ে পড়তে যা। ” আমি তাড়াতাড়ি নাস্তা করে বইয়ের ব্যাগে আমগুলো ঢুকিয়ে নিয়ে বের হয়ে গেলাম। মাস্টার মশাই আসতে আরো ঘন্টা খানেক লাগবে। আমি দৌড়ে গিয়ে মোহন কাকুর বাড়িতে উঁকি দিলাম। সামনে কাউকে দেখতে পেলাম না। এক দৌড়ে গিয়ে পুষ্পাদির ঘরে ঢুকলাম। পুষ্পাদি তার লম্বা, কালো চুলে তেল দিচ্ছিলো। আমাকে দেখেই বসতে বললো। বললাম” বসার সময় নাই গো পুষ্পাদি। দেখো কি এনেছি, লঙ্কা লবন মাখিয়ে দাও। একটু মজা করে খাই।”
“বস দিচ্ছি ” বলে পুষ্পাদি আমগুলো নিয়ে রান্না ঘরের দিকে গেলো।
লঙ্কায় আমগুলো লালটুকটুকে হয়ে গিয়েছে। খাচ্ছি আর লঙ্কার ঝালে চোখ দিয়ে পানি পরছে। পুষ্পাদি এক টুকরো আম মুখে দিয়ে বললো, ” হ্যাঁ রে, এত আম কোথায় পেলি বললি না?”
: কাল রাতে ঝড় হয়েছিলো না? তখন পড়েছিলো। এত কই আনলাম বলছো? ঘরের চালের গুলি তো উপরেই রয়ে গেলো।
: হয়েছে থাম। মুখ খানা লাল হয়ে গিয়েছে। চিনি আনছি দাড়া।
: লাগবে না দি,আমি এখন যাই। মাস্টার মশাই এসে পড়বেন যে।
: একটু বস।
একটা কাগজ আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো, “তোর সুকান্তদাকে দেখতে পেলে এটা দিবি, কারো সামনে দিস না।”
আমি কাগজ খানা নিয়ে দৌড়ে পাঠশালায় গেলাম। বাসায় ফেরার পথে সুকান্তদাকে চায়ের দোকানে দেখতে পেলাম। একটু পাশে ডেকে নিয়ে বললাম, ” দাদা, পুষ্পাদি এটা তোমায় দিয়েছে।”
: আর কিছু বলেনি তোর পুষ্পাদি?
আমি বললাম, ” না, বলেনি”।
দৌড়ে বাড়ি গেলাম।
দুপুরে খাওয়া দওয়ার পর মা ঘুমায়। আমি চুপি চুপি দরজা খুলে এক দৌড়ে পুষ্পাদির কাছে গেলাম।
: পুষ্পাদি কি করছো?
:ফাতেমা? আয়, ভিতরে আয়। কেউ দেখেনি তো?
:তোমার মা দেখেছে কিন্তু কিছু বলেনি।
আচ্ছা দি, আমাদের পাড়ার লোক তোমাদের বাড়িতে আসা নিষেধ কেন?
:ও অনেক আগের কিছু ঘটনা। জমি জমা নিয়ে কলহ আছে শুনেছিলাম।তুই বুঝবি না।
তোর সুকান্তদাকে পেয়েছিলি?
: হুম, চায়রে দোকানে ছিলো। আচ্ছা দি, ওতে কি লেখা ছিলো?
পুষ্পাদি হেসে বললো,” আরো বড় হ”
: বড়ই তো আমি। এই যে একা একা তোমার কাছে আসি।
কথা বলতে বলতে বিকেল হয়ে গেলো। পুষ্পাদি আমাকে অনেক স্নেহ করে। ইচ্ছে করে সারাদিন দিদির সাথেই থাকি। বাড়ি যাওয়ার জন্য বের হবো অমনি পুষ্পাদিদের বাগানের মালি আমাকে দেখে ফেললো। এই বাড়িতে আসার অপরাধে আমাকে আধা ঘন্টা কানে ধরিয়ে দাড় করিয়ে রাখলো।
বাড়ি গিয়ে দেখি মা দুয়ারে বসে আছে। বুঝতে দেরি হলো না মায়ের পিছনে একটা বড় লাঠি। বাঁচার উপায় না পেয়ে জোরে কান্না শুরু করে বললাম, ” মা! গলির মোড়ে অনেক কুকুর ছিলো, তাই——–।
মা দাঁড়িয়ে বললো, ‘ কাছে আয় ‘। বুঝলাম আজ আর রক্ষা নাই। মা দুয়ার থেকে নেমে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ” মেয়ে মানুষের রাতবেরাতে ঘুরে বেড়াতে নেই মা, লোকে মন্দ বলে। তোর বাবা বেঁচে থাকলে তোকে নিয়ে এত চিন্তা করতে হত না। ” বলেই মা কেঁদে ফেলল।
মাকে নিয়ে ঘরের মধ্যে গিয়ে কুপিটা জ্বালালাম। তারপর ভাতের মাড়ের মধ্যে ভাত মিশিয়ে খেলাম। খাওয়া শেষে মা কুপির আবছা আলোয় কাঁথা সেলাই করছে। সুখলা ওর জ্বল জ্বল চোখ দুটি দিয়ে কুপির দিকে চেয়ে রইল। মায়ের কাঁথা সেলাই দেখতে দেখতে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।
সকালে উঠে দেখি সুখলা আমার পাশে মেও মেও করছে। উঠে বাইরে এলাম। মা বকুল খালার সাথে উঠোনে বসে আছে। কিভাবে এখন পুষ্পা দির কাছে যাব সেই চিন্তায় উঠোনে গিয়ে ঘুরঘুর করছি। কাজ হচ্ছে না।
কিছুক্ষন পর মা বকুল খালাকে নিয়ে বাড়ির পেছনের দিকে যেতেই হুট করে বেরিয়ে পড়লাম। পুষ্পাদিদের বাড়ির কাছাকাছি যেয়ে দেখলাম সুকান্ত দা বটগাছটার নিচে কি একটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখেই বললো, ” কিরে আজ ব্যাগ ছাড়াই এলি যে!
পাঠশালায় যাবিনা? ”
: না দাদা আজ মাস্টারমশাই আসবেন না।
: ওহ্! এই নে,এই চকলেট গুলো তোর জন্য। আর এই প্যাকেটটা তোর দিদিকে দিবি।
প্যাকেটটা নিয়ে পুষ্পাদির ঘরে যাই।
পুষ্পাদি আজ লাল টুকটুকে শাড়ি পড়েছে। তার চুলের বেলি ফুলের সুভাসে ঘর ভরে গিয়েছে।
:কোথাও যাবে পুষ্পাদি?
:হ্যাঁ, মন্দিরে যাব মায়ের সাথে।
:এটা সুকান্ত দা দিয়েছে তোমায়।
পুষ্পাদি প্যাকেটটি খুলে অনেকগুলো লাল গোলাপ আর চিঠি বের করব। চিঠি পড়ে পুষ্পা দি আমার দিকে চেয়ে বলল, “এখন বাড়ি যা ফাতেমা বিকালে একবার আসিস । ”
” আচ্ছা ” বলে চলে গেলাম।
বিকালে পুষ্পাদির বাড়ি আসি।
:এসেছিস! এত দেরী করলি কেন?
:মা আজ দেরি করে ঘুমালো তাই।
:বাড়ির উঠোনে কেউ আছে?
:না দিদি।
:চল আজ তোকে নিয়ে ঘুরতে যাব।
: সত্যি বলছো দিদি?
আমি খুশিতে লাফিয়ে উঠলাম। দিদি আমাকে নিয়ে গড়ই বাড়ির দিকে এলো। অনেক সুন্দর নির্জন জায়গা। আমি চারিদিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি। কিছুটা সামনে এগিয়ে সুকান্তদাকে দেখতে পেলাম।
পুষ্পা দি আমায় কিছুটা দূরে রেখে বলল, ” তুই এখানে থাক। আমি তোর সুকান্তদার সাথে কথা বলেই চলে আসছি।
আমি জায়গাটা ঘুরে দেখছি। কিছু কিছু গাছে অনেক আম হয়েছে। ঘুরতে ঘুরতে অনেক দূর চলে এলাম। এতক্ষণে এক কোছ আম কুড়ে নিয়েছি।
ফিরে এসে পুষ্পাদি আর সুকান্তদা কে কোথাও দেখতে পেলাম না। অনেক খোঁজার পর দেখলাম পুষ্পাদির শরীর মাটিতে পড়ে আছে।দিদির কাছে দৌড়ে গিয়ে মুখের ওড়না খুলে দিলাম। দিদির সবুজ জামা রক্তে কালো হয়ে গিয়েছে।
তারপর প্রায় এক সপ্তাহ পুষ্পাদিদের বাড়িতে যায়নি। বকুল খালা এসেছে, মায়ের সাথে গল্প করছে। সুখলাকে কোলে নিয়ে পাশেই বসে আছি।
খালা মাকে বলল,
: আপা কিছু শুনেছো?
:কি কথা?
:মোহন দাদার মেয়ে পুষ্পা কাল রাতে গলায় দড়ি দিয়েছে।
দৌড়ে গিয়ে পুষ্পা দিদির বাড়িতে আসি। দেখা না পেয়ে শ্মশান ঘাটে গেলাম। দেখি মরা পোড়ানো শেষ। কাঠগুলো এখনো দাউ দাউ করে জ্বলছে।
গতরাতে ঝড়ে অনেক আম পড়েছে। ভোরবেলা কুড়িয়ে ব্যাগের মধ্যে রাখলাম। পাঠশালায় যাব মাস্টারমশাই আসতে ঘন্টাখানেক লাগবে।
আমগুলো নিয়ে দিদির চিতার পাশে বসে আছি।সময় নাই গো পুষ্পাদি,দেখো কী এনেছি, লঙ্কা আর লবন দিয়ে মেখে দাও।


এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com