Logo
নোটিশ ::
আপনার যেকোনো সৃজনশীল লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের ঠিকানায়।আমাদের ইমেইল: hello.atharb@gmail.com

ইনসাফ || অনুবাদ: ফেরদৌস আলম লাবিব

অঙ্কন ডেস্ক / ১৪৯ বার
আপডেট সময় : রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২০

আব্দুল করিম একজন দরিদ্র ভূমিদাস। ইরানের মরু পাহাড়ে ঘেরা এক ছোট্ট গ্রামে তার বাস। মেয়ে ফাতিমা, ছেলে ইউসুফ আর স্ত্রী জেবা, এ ক’জন নিয়ে তার ছোট্ট সংসার। এই পাহাড়ী উপত্যকায় তার জন্ম। এখানে সে তার ভূমি মালিকের বাগানে বিভিন্ন ফল যেমন, পীচ, দ্রাক্ষা, আঙুর, মালবেরী, কমলা প্রভৃতি উৎপাদন ও পরিচর্যার কাজ করে।
আব্দুল করিম নিরক্ষর ছিল। সে কখনো গ্রামের গন্ডিও পার হয়নি। সে এতটাই সরল ও অশিক্ষিত ছিল যে, তৎকালীন মুদ্রা ব্যবস্থা সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই ছিল না। তার পরিবারের সমুদয়  প্রয়োজনে তার মালিকই ব্যবস্থা করে দিত। গ্রামখানিও ছোট। কোনো প্রয়োজন হলে প্রত্যেকে প্রত্যেকের পাশে এসে দাঁড়াত। একবার প্রচুর ফল হলো তাদের বাগানে। তার বাগান মালিক খুশী হয়ে তাকে বিশ রিয়াল দান করল। এবং বলল, ‘তোমার পরিবারের জন্য ইচ্ছেমতো ব্যয় কর।’ সে ভাবল, মালিক তাকে অনেক অর্থদান করেছে। খুশীতে ডগ্ মগ্ হয়ে সে বাড়িতে আসল।
তার পরিবারের সকলেই আজ খুব আনন্দিত। আব্দুল করিম তাদের বলল, ‘আমি শহরে যাব। তোমাদের জন্য কী কী আনব?’ প্রিয়তমা জেবা বলল, ‘আমার একটি রেশমী পোশাকের খুব ইচ্ছে।’ ইউসুফ বলল, ‘আমার একটি তরবারি ও ঘোড়া চাই।’ আদরের ফাতিমা বলল, ‘আব্বু ! আমার জন্য ভারতীয় রঙিন রুমাল ও একজোড়া চপল আনবে।’ আব্দুল করিম তাদেরকে সবকিছু এনে দেয়ার আশ্বাস দিল। পরদিন প্রত্যুষে সে ‘মাশাদ’ শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
শহরের অনতিদূরে প্রায় প্রবেশমুখেই ইমাম শাহ্ রেজার মাজার। সুদৃশ্য মাজারখানি দেখে সে সেখানে প্রবেশ করল। মাজার সংলগ্ন মসজিদটি দেখে খুব ভালো লাগল তার। সে সবার সাথে মসজিদে নামাজ আদায় করল। মসজিদের খাদেম তাকে বলল, ‘আল্লাহর রাহে দান করলে তিনি বান্দার নেক মাকসাদ্ পূরণ করেন।’ আব্দুল করিম খুশী মনেই তাকে দুই রিয়াল দান করল।
মাশাদ শহরে এসে রীতিমতো চোখ ধাঁধিয়ে গেল তার। উঁচু উঁচু দালান কোঠা, আলোক সজ্জিত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠান ও বিপণীকেন্দ্র, প্রশস্ত রাস্তাঘাট, ব্যস্ত শহর, প্রচুর যানবাহন ও লোক সমাগম প্রভৃতি দেখে সে বিস্ময়ে ম্রিয়মান। এমনটি সে আগে দেখেনি। প্রথমেই সে ভীড় ঠেলে বাজারের এক প্রান্তে একটি কাপড়ের দোকানে ঢুকল। দোকানে হরেক রকমের বাহারি কাপড়। দোকানীকে সে কয়েকটি রেশমী কাপড় দেখাতে বলল। অবশেষে কারুকার্যখচিত একটি রেশমী কাপড় সে স্ত্রী জেবার জন্য পছন্দ করল। সে কাপড়টির দাম জানতে চাইল। দোকানী বলল, ‘কাপড়টির দাম তিনশ’ রিয়াল। তবে আপনি আমাদের নতুন খদ্দের। আপনার জন্য পঞ্চাশ রিয়াল ছাড়।’ আব্দুল করিম তো হতভম্ব। কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে বলল, তুমি মজা করছ নাতো, আড়াইশ রিয়াল। এবার সে তার পকেটের রিয়াল দেখিয়ে দোকানীকে বলল, ‘তুমি কি এই মুদ্রার দাম চাইছ? আমার কাছে বিশ রিয়াল আছে।’ দোকানী তার বোকা খদ্দেরের প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে ভর্ৎসনা করে তাকে বের করে দিল।
হতাশ আব্দুল করিম এবার চলল ঘোড়ার খোঁজে। বাজারের এক কোণে বসেছে ঘোড়ার হাট। সেখানে অনেক প্রকার চতুষ্পদ বিক্রয় হয়। একখানা নাদুস নুদুস লাল টাট্টু ঘোড়া তার বেশ পছন্দ হলো। ঘোড়াটির দাম জানতে চাইলে ব্যবসায়ী তাকে উওর দিল, ‘তুমি কত দিতে চাইছ?’ সে বলল, ‘আট রিয়াল।’ ব্যবসায়ী তামাশাচ্ছলে বলল, ‘এ দামে তুমি একটি গাঁধার দড়িও কিনতে পারবে না হে বাপু।’
ঘোড়া ও তরবারির আশা ছেড়ে আব্দুল করিম এবার চলল ফাতিমার জন্য রঙিন রুমাল ও জুতো কিনতে। মনের মতো জিনিস পেয়েও গেল সে। কিন্তু বিপত্তি বাঁধল দামে। ন্যূনতম পঁয়ত্রিশ রিয়াল দরকার তার। বেশ খানিকক্ষণ নাছোড় দোকানীর সাথে নিস্ফল দরাদরি করল সে। অবশেষে কিছুই না কিনতে পেরে অবসন্ন আব্দুল করিম গ্রামের পথে রওনা হলো। পথিমধ্যে এক ফকির তার কাছে মিনতি ভরা কন্ঠে কিছু সাহায্য চাইল। সে বলল, বাবা, খোদার ওয়াস্তে দান কর, তিনি তোমায় বহুগুণে ফেরত দেবেন।’ কোন কিছুই যখন কিনতে পারল না, তখন আব্দুল করিম ভাবল এ অর্থ দিয়ে আর কী হবে ! তারচে’ বরং খোদার রাহেই এটি বিলিয়ে দেই। যা ভাবল, তাই করল। সে ফকিরকে সব অর্থ দিয়ে দিল।
রাতে যখন সে বাড়ী ফিরে এলো, তখন ছেলেমেয়ে ও স্ত্রী তাকে এক প্রকার ঘিরেই ধরল। শহরে তার কেনা কাটার ব্যর্থতার গল্প শুনে পুত্র ও কন্যাটি বাবাকে সান্ত্বনা জানাল। কিন্তু স্ত্রী জেবা যখন শুনল, অর্থটি সে পুরোটাই ফকিরকে দিয়ে দিয়েছে, তখন সে স্বামীকে তার নির্বুদ্ধিতার জন্য বকাঝকা করল। পরদিন জেবা বিষয়টি তার জমির মালিকের কাছে নালিশ আকারে পেশ করল। মালিক আব্দুল করিমকে ডেকে বললেন, ‘দেখ, আমি রিয়াল তো দূরের কথা একটা তামার পয়সাও ফকিরকে দেই না। আর তুমি কিনা বিশ রিয়ালই ফকিরকে দিয়ে এসেছ! এর জন্য আমি তোমায় শাস্তি দেব। তোমার শাস্তি হলো, তুমি ঐ দূরের অনুর্বর মরু পাহাড়ে আমার যে ভূমিটি আছে সেখানে পানি না উঠা পর্যন্ত একটি কূপ খনন করবে এবং সে ক’দিন বাড়ীতে আসতে পারবে না।’ অগত্যা আব্দুল করিম কূপ খনন করতে চলল। বহুদিন নিরলসভাবে কাজ করার পর হঠাৎ একদিন শুষ্ক মরুর বুক চিরে মিষ্টি পানির প্রসবণ বইতে লাগল। বিষয়টি মালিককে অবগত করলে তিনি অত্যন্ত উৎফুল্ল হলেন ও তাকে খুশী মতো অনেক দিনের জন্য কাজ থেকে ছুটি প্রদান করলেন।
এদিকে কূপ খুঁড়তে গিয়ে আব্দুল করিম মাটির গভীরে কিছু মূল্যবান হীরা জহরত সদৃশ কিছু দ্রব্য পায়, যা সে ‘মাশাদ’ শহরে দেখেছিল। সেগুলো সে নিজের কাছে রেখে দেয়। একদিন এগুলোকে নিয়ে সে ‘মাশাদ’ শহরে যায়। অলংকারের দোকানে নিয়ে এগুলো সে বিক্রয় করতে চাইলে, তারা আব্দুল করিমের কাছে জিজ্ঞেস করে, ‘এগুলো তুমি কোথায় পেলে?’ আব্দুল করিম তাদেরকে গোপন বিষয়টি বলতে চাইছিল না। অসংলগ্ন উত্তর দেয়ায় চোর সন্দেহে তারা আব্দুল করিমকে নগর রক্ষীর নিকট ধরিয়ে দেয়। নগর রক্ষীরা মূল্যবান মণি মুক্তার লোভে আব্দুল করিমকে বিভিন্ন ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে, কিছু না পেয়ে কারাগারে প্রেরণ করে। কারা কর্মকর্তারাও আব্দুল করিমকে বেশ হেনস্তা করে।
এরই মধ্যে খলিফা আব্বাস একদিন স্বপ্নে দেখেন, তাঁকে কেউ বলছেন, ‘তোমার রাজ্যে একজন নিরীহ বন্দীর উপর জুলুম হচ্ছে। সে তার অত্যন্ত প্রিয় জিনিস আল্লাহর রাহে উৎসর্গ করেছে।’ ঘুম থেকে উঠে খলিফা বেশ চিন্তিত হলেন। তিনি আইন রক্ষাকারীদের প্রধানকে ডেকে পাঠালেন ও অবিলম্বে বন্দীদের ভেতর কেউ মজলুম আছে কিনা খোঁজ নিয়ে তাঁকে জানাতে বললেন। খলিফার কথা মতো কাজ হলো। তিনি জানতে পারলেন আব্দুল করিমের কথা। খলিফা নিজে এসে আব্দুল করিমের সাথে দেখা করেন। সবকিছু শুনে তিনি আব্দুল করিমকে স- সম্মানে মুক্ত করে দিলেন। তিনি তাকে অনেক উপহার সামগ্রী দেন এবং তার পরিবারের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করে দেন। আর মূল্যবান রত্নখনির সন্ধান পেয়ে খলিফাও নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করে আত্মতৃপ্তি অনুভব করেন।


এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com