Logo
নোটিশ ::
আপনার যেকোনো সৃজনশীল লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের ঠিকানায়।আমাদের ইমেইল: hello.atharb@gmail.com

গল্প: নরখাদক || আশিস চক্রবর্তী

অঙ্কন ডেস্ক / ২৯২ বার
আপডেট সময় : মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২০

দীর্ঘদিন লাইব্রেরী তে যাতায়াত এর সুবাদে, লাইব্রেরীর কর্মচারী মেহতাব আলীর সাথে ,বন্ধু আলোক আর আমার ঘনিষ্ঠতা বেড়ে গিয়েছিল। ভদ্রলোক ষাটোর্ধ,বেঁটে খাটো, সুস্বাস্থ্য এর অধিকারী। গল্পের ছলে জেনে ছিলাম তিনি একসময়  কুস্তিগীর ছিলেন। বয়েস হলেও শরীর সেভাবে ভাঙেনি। তবে ডান দিকে ঝুঁকে খুঁড়িয়ে চলতেন। আলোক আর আমার অনুমান ছিল ,কুস্তি করতে গিয়ে বোধহয় চোট পেয়েছেন।
 এক সন্ধ্যায় তুমূল ঝড় বৃষ্টি নামলো।
আলোক বললো — আজ আর বাড়ি যাওয়া হলো না বোধহয় !
 মেহতাব চাচা বললেন– ভয়ানক দুর্যোগ। তোমরা বরং আরো কিছুক্ষন অপেক্ষা করো।
আমি আলোকের দিকে চেয়ে বললাম — এরম বৃষ্টি আগে কখনো দেখিনি !রাক্ষুসে মেঘ।
মেহতাব চাচা আলোকের উত্তরের অপেক্ষা না করে , আমার দিকে চেয়ে বললেন — তোমরা আর কত কি দেখেছো ,নেহাৎই ছেলে মানুষ। তবে এর চেয়ে হাজার গুণ বীভৎস একটা রাত আমি  পেড়িয়ে এসেছি। যা ভাবলে আমার সারা শরীর শিউরে ওঠে।  আল্লার কৃপায় প্রাণ নিয়ে ফিরে এসেছিলাম।
একটা দুধর্ষ কাহিনীর ইঙ্গিত পেয়ে আমরা দুজনেই আগ্রহের সাথে মেহতাব চাচার দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম। আমি বললাম — কোনো জোরদার কুস্তির মোকা বিলা নাকি ?
— ইনসান হলে তো তাকে ধুল চাটা তাম সে এলেম আমার ছিল। কিন্তু সে কোন জগৎ থেকে এসেছিল, আজ অব্দি তার কিনারা পায়নি। এখনো নিজের চোখ কে বিশ্বাস করতে পারিনা। সে রাতে আমি ঠিক কি দেখে ছিলাম !
আলোক বললে — ভূত টুত এর খপ্পরে পড়েছিলেন নাকি চাচা ?ওসব আপনি মানেন , ? মেহতাব চাচা তখন স্মৃতির গভীর গহনে হারিয়ে একটা ঘোরের মধ্যে ধীরে ধীরে যেন প্রবেশ করছেন।তারপর খুব মৃদু গলায় বললেন — মানুষ নয় ,ব্যাস এই টুকু বলতে পারি , বাকি ও ওপরয়ালার সৃষ্টি ,নাকি শয়তানের সৃষ্টি আল্লায় জানেন।
আমার ঘটনাটা শোনবার লোভ এসে গেল। মেহতাব চাচার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম একটা প্রতিশোধ প্রবণতা কিংবা হেরে যাওয়ার লক্ষণ পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। যেটাকে তিনি এতো বছর পরেও হজম করতে পারেননি। জিজ্ঞাসা করলাম — কি হয়েছিল সে রাতে ?
প্রশ্নটা শুনে চাচা দৃষ্টিটা ছোট করে বলতে লাগলেন–কুস্তি খেলায় তখন আমার দেশ জুড়ে নাম। সেই নাম ভাঙিয়ে, খেলা ছেড়ে ,রেলের চাকরি নিয়ে ফেললাম । পোস্টিং টা হলো মুর্শিদাবাদ এর নশীপুর রেল স্টেশনে। একটা হল্ট স্টেশন। সারাদিন রাতে কয়েকটা মাত্র গাড়ি থামতো। আশেপাশে গ্রাম শহর কিছু নেই।  আমার সহ কর্মী ছিল বেশ মোটা সোটা গোল গাল চেহারার মদন কানু। আমার কুস্তির কথা শুনে আমাকে ও ওস্তাদ বলতো। স্টেশনের লাগোয়া কোয়ার্টার ছিল তাতে মাঝে মধ্যে রান্না বান্না , আরাম করতাম। স্টেশনের পিছন দিকে খানিক টা তফাতে ছিল একটা পুকুর। স্টেশন থেকে সিঁড়ি নেমে গিয়ে সে পুকুরে মিশেছে। অনেক আগে যখন স্টিম ইঞ্জিন চলতো ,ওই পুকুর থেকে নাকি ইঞ্জিনে জল ভরা হতো। রেলের গার্ড বাবু একদিন বলেছিলেন ওই পুকুরের জল নাকি কখনো শুকায় না। এর কারণ হিসেবে শুনলাম ভাগীরথী নদীর সঙ্গে নাকি চোরা একটা লিংক আছে পুকুর টার। স্টেশনের পশ্চিম দিকে অনেকটাই দূরে বয়ে চলেছে ভাগীরথী নদী। আর বিপদ টা ওই পথ ধরেই এসেছিল বলে আজ আমার মনে হয়।
আলোকের কৌতূহল হঠাৎ মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ায় ও বললো — বিপদ টা কি ?
মেহতাব চাচা ফের বললেন –স্পষ্ট মনে আছে সময়টা দুহাজার সাল। কয়েক দিনের তীব্র বর্ষণে ,ভেসে গেল ভাগীরথীর বাঁধ । জলের তলে হারিয়ে গেল সব মাটি। ইলেক্ট্রিকের খুঁটি উল্টে ,রেলের লাইন বেঁকে উপরে উঠে গেল। যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। আমি আর মদন কানু স্টেশনে বসে সে রাতে প্রমাদ গুনছি। আকাশের অবস্থাও ভালো নয়। বৃষ্টির বিরাম নেই। দুজনেই আটকা পড়লাম কোয়ার্টারে। দিন কয়েক পর জল যেমন এসে ছিল ঠিক তেমন গতিতেই পিছু টান দিল। ধীরে ধীরে জেগে উঠলো ডাঙ্গা। কিন্তু পিছনের পুকুরের চেহারা তখন অনেক প্রসারিত। জল উপছে নিচের দিকের কয়েকটা সিঁড়ি ডুবিয়ে দিয়েছে। এমনি এক সন্ধ্যে বেলা কোনো কাজ কাম নাই দেখে আমি আর মদন গল্প করতে বসলাম। মদন বললো –ওস্তাদ আপনাকে আজকে একটা আশ্চর্য গল্প শোনাবো।ছেলেবেলায় একদিন মাঝ রাত্রে ঘুম ভেঙে দেখি পোষা টিয়া টার রক্ত ,পালক বিছিয়ে আছে মেঝে তে।ভাবলাম বিড়ালের কারবার। কয়েক দিন পর দেখলাম ঘরে পোষা মুরগী টার ও একি হাল। আস্তে আস্তে গোটা গ্রামে এরম আধ খাওয়া মরা জন্তু জানোয়ার পাওয়া যেতে লাগলো। ভুত প্রেতের ভয় ছড়িয়ে পড়লো গ্রামে।
একদিন সকাল বেলা ঘুম ভেঙে দেখি পাগলা গারদে পড়ে আছি।
আমি বললাম –আচমকা তুমি পাগলা গারদে এলে কিভাবে ?
–প্রথমে আমি কিছু বুঝিনি। পরে ডাক্তারের মুখে শুনলাম ,আমি নাকি মাঝ রাত্তিরে ঘুমের ঘোরে উঠে পাশের বাড়িতে ঢুকে বাচ্চা টাকে কামড়ে খেতে গিয়ে ছিলাম। ওরা আমার মাথায় মেরে অজ্ঞান করে ওখানে এনে ছিল।
–সেকি !!তার মানে তুমি এতদিন ঘুমের ঘোরে উঠে হাঁস মুরগী কাঁচা ছিড়ে খেতে ? — আশ্চর্য হয়ে বললাম আমি।
–ডাক্তার বাবু বলছিলেন এটা একটা ভয়ানক মানসিক রোগ, নাম ক্লুভার- বুসি সিনড্রোম। এই রোগে আক্রান্ত হলে মানুষ নিজের অজ্ঞাতে অখাদ্য খায়। তারপর টানা পাঁচ বছর চিকিৎসা করে গ্রামে ফিরে এলে আমাকে সবাই মদনাসুর বলে ক্ষেপাতো।
আমি বললাম –দ্যাখো ভাই আমাকে আবার কাঁচা খেয়ে ফেলো না।
মদন মৃদু হাসলো। তারপর খাওয়া দাওয়া সেরে দুজনে শুয়ে পড়লাম। হঠাৎ কানু এসে আমার ঘরের দরজায় হাতুড়ি পিটার মতো করে আঘাত এর পর আঘাত হানলো। আমি ধড়পরিয়ে উঠে দরজা খুলে দেখি কানু ভয় পেয়ে ঢোক গিলে বলছে — ওস্তাদ !এতো রাতে পুকুরের জলে দেখি কে যেন এ মাথা থেকে ও মাথা সাঁতার কাটছে ।
আমি বিদ্যুতের আলোয় ওর চোখ মুখের অবস্থা দেখে বুঝলাম আতঙ্ক এখনো ওকে ছাড়েনি । আমি বললাম — কি বলছো কি ? এতো রাত্রে এই দুর্যোগে ,কে নামবে জলে ? আসে পাশে মানুষের বসতি ও নেই ! চলো তো দেখি।
বলে টর্চ টা হাতে নিয়ে সিঁড়ির পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। অন্ধকারের বুক চিরে বিদ্যুতের ঝলকানি নামলে এক নিমিষে চোখ ঘোরা ফেরা করতে থাকলো সমস্ত জলময় স্থানে। অনেক ক্ষন, কই ! সেরম কিছু না তো। কানু থরথর করে কাঁপছে। আর বারবার বলছে সে স্পষ্ট দেখেছে ।প্রথমটা ভেবে ছিল কোনো বৃহৎ আকৃতির মাছ। তারপর সে বিশ্বাস ভেঙে গেলে, মনে হয়েছিল বন্যার জলে কারো লাশ বুঝি ভেসে উঠেছে। কিন্তু জলময় ছুটে বেড়াতে দেখে হাত পা হিম হয়ে গেছে।
খানিকক্ষণ ওভাবে সজাগ দৃষ্টি নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে  হঠাৎ শুনি জল থেকে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আসছে। অনেক টা বিরাট কিছু জলের মধ্যে সজোড়ে নড়াচড়ার মতো শব্দটা। টর্চের আলো ফেলে খুঁজতেই চোখে পড়লো একটা মাথা যেন জল ভেদ করে ওপরে উঠেছে। কানু তৎক্ষনাৎ আৎকে উঠে পিছিয়ে গেল।তারপর কাঁপা কাঁপা গলায় বললো — ওস্তাদ ! ওই দেখেন ! দেখেছেন, একটা মাথা জেগে উঠেছে!
 আমি টর্চের আলো ওদিক টাই তাক করে দেখে চমকে উঠলাম। এ আবার কি জিনিস ! ভয় তখনও আমার আসেনি। মাথাটা ঝুপ করে ডুবে গিয়ে আবার সামনে এসে উঠলো। এবার স্পষ্ট দেখে আমার শরীরে একটা ভয়ের স্রোত খেলে গেল। মাথায় বটে, তবে ঠিক মানুষের মত চেহারা নয়। মাছের পাখনা যেমন হয় তেমন ছড়ানো চুলের মতো নেমে গেছে। চোখের পলক, ভুরু কিছু নেই। নাকের জায়গার দুটো গর্ত। ঠোঁট দুটো উল্টে যেন ভেতরে ঢুকে গেছে।মাথার দুপাশে মাছের ফুলকার মতো ঝিলি। সেটা ক্রমশ সংকোচন প্রসারণ করছে। রং ফ্যাকাশে। শরীরের যে টুকু দেখা যাচ্ছে তাতে পিচ্ছিল সূক্ষ আঁশের মতো থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু না। এ কোন জাতের জলজ জানোয়ার !! আশ্চর্য হয়ে তাকিয়েই রয়েছি, এমনসময় দেখলাম জলের তলা থেকে একটা প্রায় এক হাত সমান মাছ বার করে চিবোতে লাগলো জন্তুটা। মাছের ছটপটানি তে কাঁচা রক্ত ছিটকে পড়ছে চতুর্দিকে। হাতের তালুর জায়গায় দেখলাম কাঁকড়ার দাঁড় এর মতো দু ভাগে চেড়া। ধারালো দাঁত প্রসারিত করে আমাদের দিকে চেয়ে চিবিয়ে গিলছে কাঁচা মাছ। কসা বেয়ে নামছে রক্ত। কি ভয়ঙ্কর কুৎসিত সে দৃশ্য। কানু প্রচন্ড ভয় পেয়ে বলে উঠলো –ওস্তাদ আমার কিন্তু ব্যাপার ভালো ঠেকছে না। চলুন এখন থেকে পালায়।
এরপর ওকে এক-পা ,দু-পা পিছিয়ে অস্ফুট কিছু বলে সিঁড়িতে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যেতে দেখলাম। আচমকাই ভীষণ শব্দ করে আকাশ ফেটে যেন জল নামলো। ধীরে ধীরে পেছন পায়ে পিছোতে লাগলে, দেখলাম জন্তুটা জল ভেঙে ভেঙে সিঁড়ির দিকে এগোচ্ছে। এক মুহূর্তের জন্য টর্চ বন্ধ করিনি ।বাম হাতে টর্চ ধরে ডান হাতে জ্ঞান শূন্য কানু কে ধরে হিঁচড়ে সিঁড়ি থেকে স্টেশনের ধাপি তে তুলবার চেষ্টা করছি। খানিকটা টান দিতেই জন্তুটা জল থেকে ছিটকে একলাফে কানুর পা ধরে জলের মধ্যে আমাকে শুদ্ধ টেনে নিয়ে যেতে লাগলো। জল থেকে শরীর টা উঠে যখন শূন্যে ভাসছিল, দেখলাম প্রকান্ড কয়েকটা অক্টোপাসের শুড়ের মতো লেজ কোমরের থেকে নেমে শেষে অনেক ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। লম্বায় আন্দাজ পনের ফুট, কি তার বেশি হবে। ও দানব দেখে থতমত খেয়ে আমার হাতের টর্চ পড়ে গিয়ে গড়িয়ে জলের মধ্যে তলিয়ে গেল।
এই অব্দি শোনার পর আমার কল্পনায় যেটা এলো সেটা ভেবে বললাম — মৎস্য কন্যার কথা গল্পে সিনেমায় শুনেছি ও দেখেছি এ অসুর সেই জাতীয় কি ?
মেহতাব চাচা  চোখ মুখ পাকিয়ে বললো — সে আমি বলতে পারবো না ,কি ওর পরিচয়। মাংস খেকো জানোয়ার ছিল ওটা ,ব্যাস এই দেখেছি। আলোক বিজ্ঞের মতো বলে উঠলো — আমার মনে হয় ক্রাকেন !
মেহতাব চাচা আর আমার মুখ থেকে কৌতূহল মাখানো সমস্বর বেরিয়ে পড়লো — ক্রাকেন ?
–ইয়েস ক্রাকেন । বিদেশী প্রাচীন কাহিনী  ঘাটলে এর পরিচয় পাওয়া যায় । এই ক্রাকেন শব্দটি এসেছে ক্রাকে থেকে যার অর্থ অসুস্থ্য জীব বা বিকৃত জীব। এটি একটি স্ক্যান্ডি নেভিয়ান শব্দ।এই ক্রাকেন এর বাস গভীর সমুদ্রে।  জাহাজ ডুবির ঘটনায় ক্রাকেন এর উল্লেখ পাওয়া যায়।বিভিন্ন বর্ণনা থেকে যে টুকু বোঝা গেছে অক্টোপাসের সঙ্গে এর রূপের মিল আছে। তবে সবটাই রহস্য। মেহতাব চাচা যখন জল দানবের চেহারা টা বললো ,তখন আমি আমার জ্ঞানের পরিধিতে ক্রাকেন এর সঙ্গেই এর মিল খুঁজে পেলাম। হতেও তো পারে বঙ্গোপসাগরের জল পথ ধরে এই ভয়াল অসুর ভাগীরথী নদী থেকে বন্যায় ভেসে গিয়ে ওখানে এসে পৌঁছে ছিল।
মেহতাব চাচা সব টা শুনে বললেন –আলো থাকলে যেমন অন্ধকার থাকে তেমনি আল্লার পাক  সৃষ্টিতে শয়তানেরও বাসা বাঁধার জায়গা রয়ে গেছে সে কথা ধর্ম গ্রন্থ ও বলে । তাই সব সম্ভব , কিছু অসম্ভব না ।
আমি বললাম – এরপর কি হলো চাচা ?
চাচা আবার পুরোনো স্মৃতিতে ফিরে গিয়ে বলতে শুরু করলেন –অন্ধকারে শুরু হলো দু পক্ষের কানুর অচৈতন্য দেহ নিয়ে টানাটানির লড়াই।কি ভয়ংকর আসুরিক  শক্তি সে দানবের । আমি প্রাণ পণ চেষ্টা করেও কয়েক মিনিটের বেশি টেনে রাখতে পারিনি কানুকে। হাত বুঝি কাঁধ থেকে খসে যায়।তারপর একটা জোর হ্যাঁচকা টান অনুভব করতেই কানুর শরীর টা তরতর করে জলে নেমে গেলো শব্দ পেলাম।জলের ওপরে কানুর ছটফটানি আর আর্তনাদ শুনছি ,আর বিদ্যুতের আলোয় দেখছি ওর শরীর টাকে ছিন্নভিন্ন করে রক্তে পুকুর কে ভাসিয়ে দিল শয়তান টা। সে মুহূর্তে আমার পুকুর পাড়ে সিঁড়ির ওপর মিথ্যা আস্ফালন আর চিৎকার  ছাড়া কিছু প্রদর্শন করতে পারিনি ,কানুকে বাঁচা নোর জন্য। মনে হলো আমি কিসের ওস্তাদ ?  পরক্ষনেই অনুভব করলাম আমার সমস্ত শরীর শক্তি হীন। বিস্ফারিত চোখ আর কম্পমান হাত দুটো যেন খসে পড়তে চাই। বুকের ভেতরে একটা চাপ ধরা ভাব। মুখ যেন কেউ সেলাই করে দিয়েছে।একটি শব্দ, কি চিৎকার কিছু নেই। ওপর থেকে নদীর জলের মতো বৃষ্টি ঝড়ছে।সেই অফুরন্ত জলে আমার চোখের নোনা জল ধুয়ে যাচ্ছে। মদন কানু যে আমার সব সময়ের সঙ্গী ছিল, এভাবে তাকে হারাবো, কিছুতেই মানতে পারছি না।এরপর আমার নিজের প্রানের ভয় জন্মালো। খুব সন্তর্পণে একটা একটা করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে স্টেশনের মেঝেতে বসে পড়লাম। ভয়ার্ত  চোখে সেখান থেকে পুকুরে চেয়ে দেখি এতো ক্ষন আমি যা দেখে ছিলাম তা ছিল আংশিক । পূর্ন ছবিটা আমার চোখের সামনে ধরা দিল এবারে । একটা নয় আস্তে আস্তে পুকুর থেকে মাথা তুলে দাঁড়াতে দেখছি অনেক গুলো ওই চেহারা জন্তু গুলো কে। স্পষ্ট দেখছি বজ্রের আলোয় জটলা করে এক জায়গায় এসে কাড়াকাড়ি করে বিকট চিৎকার এর সাথে ভাগাভাগি করে খাচ্ছে কানুর দেহাংশ। মাংস হাড় চিবানোর কচমচে আওয়াজ আমার কান ভেদ করে মাথার ভেতর যেন ফাটিয়ে দিতে চাইছে আমার শিরা উপশিরা। শরীরের রক্ত মাখা মাংসপিন্ড প্রত্যেকটা জন্তুর মুখে ঝুলে আছে। হঠাৎ পায়ের সামনে পেলাম ভারী কিছু পড়ার শব্দ। বস্তু টা হাতে তুলে নিয়ে দেখি রক্ত মাংস-মাখা মদন কানুর আধ খাওয়া মাথা।শয়তান টা আমার কাছে ছুঁড়ে ফেলেছে। সেই বিভীষিকাময় দৃশ্য দেখে আমার চোখ বুজে গিয়ে কখন জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম জানি না। স্টেশন সংলগ্ন একটা তাল গাছে বিরাট শব্দ করে বাজ পড়লে চেতনা ফিরে এলো। কতক্ষন পড়ে ছিলাম জানি না। মনে হয় তখন অনেক রাত। এতো ক্ষনের বৃষ্টি তে সমস্ত সিঁড়ি জলের তলায় ডুবে গিয়েছে। জল ছাপিয়ে উঠে পড়েছে স্টেশনের মেঝেতে। জলের ওপর তাকিয়ে দেখি তারা সব উধাও ।কোন সাড়া শব্দ নেই। যেন একটা খারাপ স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে জাগলাম। ভীষণ ক্লান্ত মনে হলো নিজেকে। কোন রকমে উঠে গিয়ে কোয়ার্টারে ঢুকে দরজা বন্ধ করে বাকি রাত কাটিয়ে সকালেই এখান থেকে সরে পড়বো ,এই ভেবে ছেচড়ে ছেচড়ে চললাম ঘরের দিকে। উঠে দাঁড়াবার শক্তি সাহস ভরসা কিছু নেই। ঘরে ঢুকে রেলের লোহার মোটা গ্রিল বন্ধ করে ঘরের কোনায় পরে রইলাম। ঘর ভর্তি অন্ধকারে শুধুই আমার নিঃস্বাস পড়ছে। বাইরে তখনও জলের শব্দ। ঘন্টা খানিক পর হবে বোধহয় , শরীর টা থিতিয়ে উঠেছে ,দেখি ঘরের ভেতর জল কলকল শব্দ করে ঢুকছে। বুঝলাম মেঝে ছাপিয়ে সে জল আমার ঘর এবার ভাসাবে। কাঠের চৌকি চেপে বসলাম গুটি সুটি মেরে।  দেখি চৌকি দুলে উঠছে ,। ঘাবড়ে গিয়ে চৌকির কিনারা শক্ত করে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে পড়ে রইলাম। মনে মনে আল্লা কে দোয়া করছি । হঠাৎ আমার গায়ের ওপরে লম্বা একটা সাপের মত জিনিস নড়ে ,চলে গেল। আবার, বার বার ,অনেক বার একি রকম অনুভূতি। টনক টা নড়ে উঠলো। বুকের ভেতর যেন হাপর চলছে। শয়তান টা জলের সাথে আমার গন্ধে ঘর অব্দি পৌঁছে গেছে। ওর যে কোমর থেকে লম্বা শুড়ের মতো অঙ্গ দেখে ছিলাম।গ্রিলের ফাঁক দিয়ে সেটা ঢুকিয়ে আমাকে হাতড়ে দেখছে । ভয়ে আমি নিথর হয়ে পড়ে রয়েছি।স্বাস নিলে বুকে খচ খচে ব্যথা হচ্ছে। ওমনি শুনলাম প্রচন্ড শব্দ।রাক্ষস টা লোহার গ্রিল মুচড়ে বুঝি ভাঙছে। কাঁকড়ার মতো দাঁড়য়ালা হাতের বজ্র শক্তি ওই লোহার গ্রিল কতক্ষণ আর সইবে! তারপর নাকে আসলো ভয়ঙ্কর মাংস পচার মতো দুর্গন্ধ । স্বাস বন্ধ হয়ে গিয়ে যেন সে গন্ধ তে আমার পাকস্থলী উগলে বেরিয়ে আসার উপক্রম। নিস্তব্ধ ঘরে মুখের সামনেই সেই কানের ঝিল্লি কাঁপানো ফর ফর শব্দ পেলাম। আমার দু চোখ বন্ধ। হাত পা শুকনো পাতার মতো কাঁপছে। একটা উষ্ণ লকলকে কি যেন আমার চোখে মুখে জানোয়ার টা বুলিয়ে দিল। সম্ভবত জীভ। লালা ঝরে পড়ছে আমার মাথার ওপর। এরপর আমার সর্বাঙ্গ নিস্তেজ হয়ে গিয়ে আমি আবার জ্ঞান হারালাম। জ্ঞানটা ফিরলো তীব্র যন্ত্রনা আর জানলার ফোকর দিয়ে সূর্যের আলোটা চোখে পড়ে। দুর্ধর্ষ রাত আর নেই। যন্ত্রনায় মুখ কুঁচকে তার উৎস খুঁজতে ,দুর্বল শরীরে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করতে যেই পা ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছি ,অনুভব করলাম আমার ডান পা অসাড়।কোনো রকম চালনা শক্তি নেই। শুয়ে থেকেই হাতড়ে হাতড়ে দেখে চমকে ,ফের  মুষড়ে পড়ে ,পাগলের মতো কান্নায়  ভেঙে পড়লাম –একি !!  আমার এ অবস্থা কি করে হলো ? আল্লা এ আমার কি হলো ? আমার ওপর রেহেম করো আল্লা !!
হাত ছুঁয়ে দেখি হাঁটুর নীচ থেকে আমার পা নেই।   আমি যখন অচৈতন্য ছিলাম সেই সময় আমার পা টা কামড়ে কেটে নিয়ে চলে গেছে ওই রাক্ষুসে জল দানব। যন্ত্রণায় শরীরে তীব্র জ্বর , রক্তের স্রোত জলে মিশেছে, বাকি রাত টুকুতে। হাত বুলিয়ে দেখি একটা লালার মতো চট চটে সারা শরীরে মেখে আছে। মনে হচ্ছে আমাকে বুঝি গিলে নিয়ে আবার উগলে ফেলে দিয়ে গেছে দানব টা। ওরা আমাকে খেতে পারেনি। কারণ ইতি পূর্বে মদন কানুর স্থূলকায় শরীর টা খেয়ে হজম করতে তখনও পারেনি বোধ হয়।
মেহতাব চাচা কাহিনী বলা শেষ হলে রুমাল বার করে চোখের জল মুছলেন।বুঝলাম সে রাতে মদন কানু কে হারানোর ব্যথা সারাজীবনেও তিনি ভুলবেন না। জীবনে যিনি অনেক বাজি জিতেছেন, তার এমন এক অদ্ভুত জীবের কাছে পরাজয়, তিনি মেনে নিতে পারেননি।পরক্ষনেই দেখলাম তিনি টেবিলে মাথা রেখে ডুকরে ডুকরে কাঁদছেন।
আলোক একটা লম্বা হাঁই ছাড়লো। তারপর আমার দিকে চেয়ে ঠোঁট উল্টে একটা বিশ্রী ইঙ্গিত দিলো। বুঝলাম ওর এটা অবাস্তব ঠেকেছে।সমস্ত কাহিনীটা খানিকটা বিশ্বাস হলেও আমার ওই পা কাটার জায়গা টাই খটকা লাগলো। কারণ চাচা এখনও তো দু পায়েই হাঁটেন ! ওখানেই  বিশ্বাস টা আটকে পড়লো। মেহতাব চাচা আমাদের মনের অস্বস্তি আর আমরা দুজনেই ওনার ডান পা এর দিকে চেয়ে আছি লক্ষ্য করে ,ওনার প্যান্টের ফোল্ড টা আস্তে আস্তে তুলে হাঁটুর কাছ থেকে কি জানি কেমন একটা বাঁধন খুলে আলগা করে ফেললেন কাঠের নকল পা টা।
কাটা পা দেখে দু জনের বুকটা ধড়াস করে উঠল ! এরপর আমি আর আলোক বিস্ফারিত চোখ আর ঝুলে পড়া থুতনি নিয়ে চেয়ে থাকা ছাড়া একটি বাক্য খরচ করতে পারিনি।


এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com