Logo
নোটিশ ::
আপনার যেকোনো সৃজনশীল লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের ঠিকানায়।আমাদের ইমেইল: hello.atharb@gmail.com

গল্প: ওরা কারা || সানভীর হোসেন

অঙ্কন ডেস্ক / ১৯৫ বার
আপডেট সময় : সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২০

দুপুর ২ টা । অতি বিরক্তির সঙ্গে ছাঁদে এসেছিলাম জামা শুকাতে দিতে। হঠাৎ কাছাকাছি একটি ফ্ল্যাটের দিকে চোখ পরলো। নতুন একটি পরিবার উঠেছে হয়ত, গাড়ি থেকে জিনিস পত্র নামানো হচ্ছে। যখনই ফিরে যেতে গেলাম, হঠাৎ চোখে পরলো কালো জ্যাকেট এবং জিন্স পড়া আমার বয়সী একটা মেয়ে গাড়ি থেকে নামলো। মুখ সম্পূর্ণ ঢাকা ওড়না দিয়ে। আর চোখে কালো সানগ্লাস। বিষয়টা স্বাভাবিক হলেও আমার কাছে কিছুটা অন্যরকম লাগে।রুমে ফিরে গেলাম। বিকেলে প্রাইভেট থেকে ফিরে ভাবলাম ওই ফ্ল্যাটের সামনে একবার যায়ে আসি।  গিয়ে দাড়ালাম ফ্ল্যাটের সামনে। কল দিলাম দিপ্তকে। ” দোস্ত নিচে আয়, কথা আছে”। দিপ্ত ওই ফ্ল্যাটের ৬ তলায় থাকে। ও আসার পর এক সাথে গেলাম পাশের দোকানে চা খেতে। জিজ্ঞেস করলাম আজ দুপুরে কারা উঠেছে তোদের ফ্ল্যাটে? কিছু জানিস?  ও বল্লো ” হুম। চট্টগ্রাম থেকে এসেছে এরা। দুটি ফ্যামিলি। দুজন ভাই। ” একটা মেয়েকে দেখলাম, ও কে?” দিপ্ত বল্লো “ওই দুই ভাইয়ের ভেতর বড় ভাইয়ের একমত্র মেয়ে, কেমন যানি অদ্ভুত ! মুখ ঢাকা। কোনো কথা বলে না। আজকালকার মেয়েরা তো কত চটপটে”। আমি বল্লাম “আমিও ওর গেটআপ দেখে এটাই ভেবেছি।” জিজ্ঞেস করলাম, “আর অন্য ভাইয়ের কয়েকজন ছেলে মেয়ে?” “তার দুই ছেলে। আমাদের থেকে ২/৩ বছর জুনিয়র। কিন্তু তুই এত কিছু জানতে চাচ্ছিস কেন??” আমি বল্লাম, ” এমনিই ভাই! এলাকায় নতুন, তাই জিজ্ঞেস করলাম!” দিপ্ত বল্লো “আচ্ছা”।
এরপর পরের দিন আবার গেলাম ফ্ল্যটের সামনে। ওই মেয়েটাকে দেখার ইচ্ছা। কিন্তু দেখা হলো না! প্রায় নিয়মিত যেতাম। শুধু একদিন দেখেছি, জানালায় দাড়িয়ে ছিল। আমি তাকাতেই সরে গেল। কিন্তু আমি তাকিয়ে রইলাম! ৬ দিন এভাবেই চললো। ৭ম দিন। দাড়িয়ে আছি ফ্ল্যটের সামনে, উদ্দেশ্য মেয়েটিকে দেখা। কিন্তু কেন দেখতে চাই জানি না!  হঠাৎ দেখালাম ৪ তলার জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে মেয়েটি। আমি দেখতেই ভেতরে চলে গেলো! আমি দাড়িয়ে রইলাম। ফোনটা বের করে দিপ্তক কল করতে যাবো, এমন সময় দেখি গেট থেকে মেয়েটি আমাকে ডাকলো! ” এই যে ভাইয়া, এদিক আসুন একটু” আমি একদম চমকিয়ে গিয়েছিলাম। এগিয়ে গেলাম তার দিক। গেটের সামনে যেতেই দেখলাম দুটি ছেলে বের হয়ে আসল। বুঝলাম এরা কারা। আমার সামনে এসে বল্লো, কি সমস্যা কি?? এখানে দাড়য়ে আছো কেন? কি চাই? অনেক দিন খেয়াল কিরেছি।কথা বলার ধারণ দেখে বুঝলাম এরা এখনো বাচ্চা। খেয়াল করিনি যে মেয়েটা ওদের দুজনের পিছনে এসে দাড়িয়েছে।আমি কিছু বলতে যাবো, হঠাৎ চোখ পড়লো ওর দিকে।
প্রথমবার ওকে দেখালাম! আমি কিছুক্ষণের সম্পূর্ণ চুপ হয়ে গিয়েছিলাম। মুখের বাম অংশটা চুলের কারণে ঢাকা, মনে হলো ঝলাসানো। ওর দিক তাকাতেই  দ্রুত ভেতরে চলে গেল! আমি চুপ হয়ে দাড়িয়ে ছিলাম। ওরা দুই ভাই কি যেন বলছিল, শুনিতে পাইনি। দিলাম একটা ধমক। চুপ হয়ে গেলো, তারপর স্বাভাবিক ভাবে জিজ্ঞাস করলাম ” নাম কি তোমাদের?”। তারা জবাব দিবে না। কিন্তু খাতির করতে আমার বেশি সময় লাগেনি। ওদের বল্লাম আসো হাটি। ওরা বল্লো ” না, আম্মু বকা দিবে” আমি বল্লাম ” আরে ধুর কিছুই হবে না”। ওরা শেষে বাধ্য হয়ে আসল। ফ্ল্যাটের কাছে একটি দোকান গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম চা খাবে নাকি। ওরা  খাবে না। বুঝলাম এখনো এরা বাইরের পরিবেশের সাথে অতটা সম্পৃক্ত না। আমি চা নিলাম, আর ওদের কোল্ড ড্রিঙ্কস নিতে বল্লাম। তারপর শুরু করলাম প্রশ্ন করা। বল্লাম, তোমাদের চাচাতো বোনের কি হয়েছে? দুজনে একসাথে বলা শুরু করলো, ওর মুখে এসিড মারা হয়েছে। আমি শুনে কি বলবো বুঝতে পারলাম না। তারপর ঘটনা সম্পূর্ণ শুনলাম ওদের কাছে। ওর নাম সানিয়া। ৫ মাস আগের ঘটনা, কেউ জানেনা কি হয়েছিলো। স্কুল থেকে আসার পথে হয়েছিল। রাস্তা সম্পূর্ণ ফাকা ছিল, একজন ওকে দেখতে পায় বেহুশ অবস্থায়, তারপর হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতাল থেকে বাসায় কল আসে। অনেক সময় লেগেছে সুস্থ হতে। মেয়েটিরও কিছু মনে নেই কি হয়েছিল। তারপর কি কারণে যানি তারা কাউকে না জানিয়ে চট্টগ্রাম ছেরে বরিশাল এসে পড়ে। কথা শেষ করলাম। বল্লাম আগামীকাল আবার দেখা করো। তোমাদের সাথে কথা বলে ভালো লাগলো। ওরা আসলে ভুলেই গিয়েছিল যে আমাকে ওরা সায়েস্তা করতে এসেছিল কারণ আমি ওদের বাসার উপর নজর রাখি।
রাত ০২:৪৪। বের হবার কথা। সব প্লান রেডি। বুক ধক ধক করছে। আজকে সকালেই প্লান করেছি। মহাসড়কের পাশের দেয়াল গুলোতে গ্রাফিতি করবো। স্প্রে কিনে রেখেছি। ঠিক ৪৫ এ নামলাম। শেরে বাংলা মেডিকেলের সামনে দেখা করার কথা সাবিত এবং নুসহাত আপুর সাথে। একমাত্র তারাই রাজি হয়েছেন এটি করতে। সবার আগে সিটি কর্পোরেশন এর বিশাল দেয়ালে প্রথম লেখাটা লিখলাম।
       ” ৪ মাসে ৪০ এর অধিক ধর্ষণ “
                     আইন থাকলেও
               তার যথাযথ প্রয়োগ নেই!”
         বিচার হচ্ছে না ধর্ষণকারীদের!
                       আর কত??”
 এর পর লেখায় ভরে দিলাম সম্পূর্ণ শহর। সিসি ক্যামেরায় যাতে না দেখা যায় তাই মুখ ঢেকে নিয়েছি। ৩:৫৫ তে আমাদের আজকের কাজ শেষ হলো। ফ্লাস্কে চা আনা হয়েছি। মাঝ রস্তায় বসে চা খেলাম, আর সাবিত ভাইয়ার গান! আহ, অসাধারণ অনুভুতি। ক্লাস টেনে পড়ি আমি, বিশ্বাস হয় না! হঠাৎ দেখলাম দুর থেকে পুলিশের গাড়ি আসছে একটি। সব ব্যাগে রেখে সাইকেল নিয়ে সবাই ভিন্ন ভিন্ন দিকে চলে গেলাম! প্লান করা ছিলো আগেই! ঝড়ের বেগে সাইকেল চালিয়ে পৌছালাম বাসায়!প্রচুর উত্তেজনার ভেতরে ছিলাম ! গেট খুলে ঢুকতে যাবো,হঠাৎ ভাবলাম ওই ফ্ল্যাটের দিক তাকাই। তাকিয়ে যা দেখালাম, তার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না! সানিয়া ছাদে দাড়িয়ে আছে! সিনিয়া নাও হতে পারে, কারণ আমি শুধু ৬ তলার ছাদে একটি মেয়েকে দাড়িয়ে থাকতে দেখলাম, কিন্তু মেয়েটি যে সানিয়া, সেই বিষয়ে আমি শতভাগ নিশ্চিত ছিলাম। হঠাৎ সানিয়া আমাকে দেখতে পায়। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে দ্রুত পায়ে চলে যায়। কিন্তু এত রাতে সে ছাদে কেন? তার কি ভয় নেই? চেহারায় সমস্যা থাকার কারণে হয়ত দিনে বাসা থেকে বের হয় না। তাই হয়ত রাতের আধারে ছাদে হাটাহাটি করে। আমি আর কিছু না ভেবে বাসায় উঠলাম। খুব ভয়ে ছিলাম। যদি বাসায় জেনে যায়! তবে জিবনে একটা অসাধারণ অভিজ্ঞতা হলো আজ। জানি দেয়ালে এসব লিখে কনো লাভ নেই। অপরাধ হবেই, এটাই দুনিয়ার নিয়ম।
ঘুম থেকে উঠে বের হলাম, দোকান থেকে নাস্তা আনতে হবে, সবসময়ের মত ওই ফ্লাটের দিক তাকালাম। মানিক ভাইয়ের দোকানে গেলাম পরাটা কিনতে। ইনি আমাদের এলাকার খুব বিখ্যাত একজন হোটেল ব্যবসায়ী। আমার খুব পছন্দের মানুষ। এলাকার সব খবর তার কাছে থাকে। কথার মাঝে আজ জিজ্ঞেস করলাম ওই ফ্লাটে নতুন পরিবারটার কথা। মানিক ভাই বল্লো ” তারা চট্টগ্রাম থেকে এসেছে। দুই ভাই আর তাদের স্ত্রী” জিজ্ঞেস করলাম তাদের কনো ছেলে মেয়ে নেই? ” বড় ভাইয়ের মেয়ে আর ছোট ভাইয়ের দুই ছেলে ছিল। ওরা ৩ জন স্কুলে পড়তো। একবার স্কুল থেকে আসার সময় হারিয়ে যায়। অনেক চেস্টার পরও পাওয়া যায় নি।পুলিশও কিছু করতে পারেনি। কনো অপহরণকারিদেরও কল আসে নি।  এই ঘটনার পর তারা বরিশালে চলে আসে”। আমি চুপ। মাথা কাজ করছে না। মানিক ভাই কি অন্য কারো কথা বলেছে নাকি? নাকি আমি স্বপ্ন দেখছি? কারণ আমার মাথায় সারাদিন ওদের কথা ঘোরে। দিপ্ত আমাকে যা বল্লো তা কি মিথ্যা? কিন্তু আমি নিজেই তো দেখেছি, এমনকি কথাও বলেছি। আমার মাথা কাজ করছে না। বাসায় এসে শুধু এক গ্লাস পানি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ালাম। স্কুল নেই আমার আজকে। ঘুম ভাংল দুপুর ১২ টায়। উঠে ফ্রেশ হলাম। চুপচাপ ছিলাম একদম। একটা ঘোরের ভিতরে ছিলাম যেন। আজ সকালে কি শুনলাম মানিক ভাইয়ের কাছে? দিপ্তকে কল দিলাম। দেখা করতে বল্লাম।
” তোদের ফ্ল্যাটে যারা নতুন উঠেছে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাস করেছিলাম না তোকে?’ দিপ্ত বল্লো ” হ্যাঁ। কেন কি হইসে? ” আবার বলতো তাদের কথা, ” দুই ভাই ও তাদের স্ত্রি, চট্টগ্রাম থেকে এসেছে বরিশাল। ব্যাংকে জব করে দুজনে।” আমি জিজ্ঞেস করালাম, ” আর তাদের ছেলে মেয়ে? ” তাদের কনো ছেলে মেয়ে নেই”
“কি?” কিন্তু তুই যে বলিছি একটা মেয়ে আর তুই চাচাতো ভাই আছে তাদের সাথে” দিপ্ত বল্লো ” আমি আবার কবে এই কথা বল্লাম !” আমি কি বলবো বুঝতে পারছি না, মাথা কাজ করছে না। হেটে চলে আসলাম দোকানে। একটা কোল্ড ড্রিঙ্কস নিলাম। কি হচ্ছে এগুলো? আমার মাথায় সারাদিন ওই মেয়ের কথা ঘোরে। আর আজ জানতে পারলাম তারা আসলে বাস্তবে নেই। তারা মৃত নাকি জিবীত তাও জানিনা! আর কিছু ভাবলাম না, সোজা চলে গেলাম ওই ফ্লাটের সামনে, ওই ২ ভাই যে বাসায় থাকে তানাএকটি দরজায় নক দিলাম। ছোট ভাইটা দরজা খুল্লো, ” ভাইয়া কেমন আছেন, কি হয়েছে, কিছু বলবেন?” আমার বুক ধক ধক করছে  কাপা গলায় বল্লাম “তোমার ভাই কই? ডাক দাও, কথা আছে তোমাদের সাথে ” ও ভিতরে চলে গেল। ওদের মা সম্ভবত রান্না করছিলেন, তাই আমি এসেছি টের পাননি। ওরা দুজন আসল দরজায়। বল্লাম নিচে আসো, একটু গল্প করবো ৫ মিনিট। ” আচ্ছ, মাকে বলে আসি” এটা বলে ভিতরে চলে গেল এবং সাথে সাথে ফিরে আসল। ” চলো ভাইয়া” সিড়ি দিয়ে নামার সময় পাশের ফ্লাটের দরজা খুলে সানিয়া বের হলো। ” কোথায় যাস তোরা”? ভাইয়ার সাথে নিচে যাই গল্প করতে, উত্তর দিল ওরা। দাড়া আমিও আসি। মনে হয় আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল সানিয়া, কারণ সে ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছিল। আমি নামছি সবার আগে, আমার পিছনে ওরা তিন জন।
রাত ১১ঃ৪৫। দুপুর ১২ঃ৩০ এ বাসা থেকে বের হয় আসলান। ১১ ঘন্টা হয়ে গিয়েছে।  এখনো বাসায় ফিরেনি সে।  শেষবার দিপ্তর সাথে দেখা হয়। এরপর আর কেউ তাকে দেখেনি।
১ মাস হয়ে গেল, কোনো খোজ নেই আসলানের, কোথায় গিয়েছে বা নাকি কেউ অপহরণ করেছে, কিছুই জানা যায়নি।
আর ফিরবে না আসলান। আর কোনো দিনও পাওয়া যাবে না তাকে।
আসলান এখন সানিয়া আর ওর দুই চাচাতো ভাইয়ের সাথে আছে। ওই দুই ভাইয়ের নাম শিহান ও রিহান। রাত ১২ টা বাজলেই ওরা বেরিয়ে পরে। বিভিন্ন বাসার ছাদে ঘুরাঘুরি করে। যখন যেখানে ইচ্ছা যায়, যা ইচ্ছা করে, কেউ কিছু বলে না, কেউ দেখতে পায় না, কেউ জানে না, আর জানবেও না কোনোদিন।
 সানিয়া,  শিহান, রিহান, তারপর আসলান। এরা এখন আর মানুষ না।  তাদের আর বয়স বারবে না। সারাজীবন এরকম থাকবে। এদের মৃত্যু নেই। এই জিবন তাদের কাছে কখনোই একঘেয়ে লাগবে না। তারা একদম আলাদা, এদের কথা কেউ কখনও কল্পনা করতে পারবে না। এরা চিরকাল থেকে যাবে লোকচক্ষুর আড়ালে।
সেদিন দুপুরে, সানিয়া, শিহান ও রিহান জানতো যে আসলান ওদের খোজ করতে আসবে। তাই ওরা আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল। প্রথম দিকে ওরা অবাক হয়েছিল কারণ আসলান ওদের দেখতে পায়। ওদেরকে তো কারো দেখতে পাওয়ার কথা না! একসময় ওরা বুঝতে পারে যে আসলান ওদেরই মত । তাই ওরা এতদিন অপেক্ষা করে। শেষ মেষ সেদিন দুপুরে ওদের দলে যুক্ত করে ফেলে,  যেভাবে সানিয়া ও তার দুই ভাইকে যুক্ত করা হয়েছিল। কারণ ওরাও এরকম একজন অবাস্তব মানুষকে দেখতে পেতো।


এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com