Logo
নোটিশ ::
আপনার যেকোনো সৃজনশীল লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের ঠিকানায়।আমাদের ইমেইল: hello.atharb@gmail.com

গল্প: প্রতিত্তোর || মো. নাবিল উল্লাহ

অঙ্কন ডেস্ক / ২৮ বার
আপডেট সময় : বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২০

সিএ ফার্মে চাকরীর সুবাদে প্রতিদিনই ফাইলপত্র নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে হয় হাসনাতকে। কিন্তু বিশেষ কারণে আজ তার ছুটি। অনেকক্ষণ যাবত হাসনাত নিলক্ষেত বাসস্টেন্ডে দাঁড়িয়ে। কাজলা যাওয়ার পরপর ছয়টি বাসের একটিরও হাতল ধরে ঝুলে উঠতে পারছে না বেচারা।হাসনাত মনে মনে ভাবছে, ইস! যদি এই ব্যস্ত নগরী থেকে চিরতরে বিদায় নেয়া যেত! কিন্তু খরখরে রোদ আর ব্যস্ত নগরীর ভিড়ে তার এই আক্ষেপ বরাবরই তুচ্ছার্থক। মিনিট পাঁচেক পর খুব দস্তাদস্তি করে একটা বাসে উঠে দাঁড়িয়েই স্বস্তির নিশ্বাস নিতে লাগলো হাসনাত।
একটু পরেই সামনের সিটে বসা ষাটোর্ধ এক ভদ্রমহিলা চেঁচামেচি করতে লাগলো,’এই ছেলে, এটা দাঁড়ানোর জায়গা? ফ্যানের বাতাস লাগছে না তো আমার গায়ে,অন্য জায়গায় গিয়ে দাঁড়াও,কী যে গরম বাবা’।
হাসনাত হতভম্ব হয়ে গেল।তবে চেহারায় তার বিন্দুমাত্র ছাপ নেই।কারন এসব অপমান লাঞ্চনা তার কাছে নতুন কিছু নয়।হাসনাত অনেকটাই অভ্যস্ত।বাসে ঝুলতে ঝুলতে প্রতিদিনই রাজ্যের সব চিন্তাভাবনায় মগ্ন থাকে হাসনাত।
বাসটি মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার অতিক্রম করছে।ঝুলন্ত যাত্রির সংখ্যা এখন নগন্য। চারপাশ থেকে আবহমান বাতাস আর ইঞ্জিনের দুরন্ত বেগে দুলতে দুলতে ক্লান্তির ঘাম এতক্ষণে শুকিয়ে গেছে।কিন্তু ভেতরের ক্লান্তি যে দিনদিন বেড়েই চলছে সেটা হাসনাত হাঁড়েহাঁড়ে বুঝতে পারছে।পরিবেশটা কিছুটা রোমান্টিক হলেও হাসনাত এখন চিন্তা করছে তার চাকরিটা নিয়ে।আজ প্রায় দুইবছর যাবত টিউশন আর সিএ ফার্ম থেকে আসা কিছু টাকার পুরোটাই সে খরচ করছে বিভিন্ন সরকারি পরিক্ষার ফী আর বইপত্রের পেছনে। কিন্তু এখনো চাকরির কোনো এসপারওসপার নেই। বাবার পেনশনের জমানো টাকায় কেনা দোকানের ভাড়া দিয়েই প্রতিমাসে চলে হাসনাতের চার সদস্যবিশিষ্ট সংসার। ছোটভাই হাসিব মেধাবী ছাত্র বলে তার পড়াশোনার খরচ নেই বললেই চলে।বাসটি গন্তব্যস্থলে আসতেই হাসনাত নেমে পড়লো। বাড়িতে গিয়ে ক্লান্ত শরীর নিয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লো।
এতসব টানাপোড়েনের মাঝেও হাসনাতের জীবনের আরেকটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো তার ভালোবাসার মানুষ সামিয়া। ভদ্রসভ্য চুপচাপ আর মিশুক স্বভাবের এই মেয়েটির সাথে তার সেই কলেজলাইফ থেকে সম্পর্ক।কিন্তু সেই চিরায়ত ভালোবাসার সম্পর্কে একটি প্রতিবন্ধকতা দিনকেদিন হাসনাত আর সামিয়াকে গ্রাস করেই যাচ্ছে। দুজনের পরিবারের সবাই তাদের সম্পর্কের কথা জানলেও সামিয়ার পরিবার সরকারি চাকরিজীবী পাত্র ছাড়া মেয়ে বিয়ে দিতে নারাজ। সামিয়াও পালিয়ে বিয়ে করার পক্ষে অমত। এদিকে রোজরোজ পাত্র পক্ষের সমন্ধ তাড়ানোর খেলায় মেয়েটি বেশ ক্লান্ত।
কিন্তু এভাবেই চলতে থাকে মাসখানেক।
৮ মাস পর…
হাসনাতের বাবা খুব অসুস্থ। কয়েক সপ্তাহ যাবত হাসপাতালে ভর্তি। বয়স বেশি হওয়ায় রোগব্যাধি জড়িয়ে ধরেছে সাদাসিধে সাবলীল এই মানুষটিকে। তবু হাসনাত আজ একটু প্রফুল্লিত। হাসনাত একটি সরকারি চাকরির রিটেনে উত্তীর্ণ হয়েছে। সামনের সপ্তাহে ভাইভা পরিক্ষা। কাগজপত্র ফটোকপি করতে বেরিয়েছি হাসনাত। হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠলো। সামিয়ার কল। হাসনাত উৎসুক কন্ঠে কথা বলতে লাগলো,
-হ্যাঁ, ঘুম শেষ হয়েছে আপনার?
-হাসনাত, আগামী মাসের ২২ তারিখ আমার বিয়ে।
-সামিয়া, মজা করছো আবারো?
-না, সব কথা পাকাপোক্ত। তুমি ঐ সিএ ফার্মের পেছনেই ঘুরে বেড়াও সারাজীবন।আমার ধৈর্য অনেক আগেই শেষ।
-কী বলছো এসব? মাথা ঠান্ডা করো প্লিজ।
(কল ডিসকানেক্টেড)
ফোন পকেটে রাখতে রাখতে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই হাসনাত থমকে গেল।বিধাতার ওপর চরম ভরসা নিয়ে হাসনাত ভাবতে লাগল, কোনো এক ভাবে হয়তো বিয়েটাকে আটকে ফেলা যাবে। সামিয়া আমাকে ছাড়া কাউকে মেনে নিতে পারবে না’।
একসপ্তাহ পর…
হাসনাত সামিয়ার সাথে সাতদিন যাবত যোগাযোগ করতে পারছে না কোনোভাবেই।সামিয়ার মোবাইল বন্ধ। কিন্তু তার থেকেও খারাপ সংবাদ হচ্ছে হাসনাতের বাবার ক্যান্সার ধরা পড়েছে। ডাক্তাররা জানিয়েছে অবস্থা আশংকাজনক। বাকিটা উপর ওয়ালার হাতে।
হাসনাত কী করবে কিছুই ভাবতে পারছে না।একবার ভাবছে পালিয়ে বিয়ে করবে।আরেকবার ভাবছে সমাজ আর বাস্তবতার কথা। অসহায় মুখ নিয়ে সেদিন ভাইভা পরিক্ষার বোর্ডে ঢুকে বেচারা খুব ভালো কিছু একটা করতে পারেনি। কিন্তু সে এখনো আপ্রান চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে স্বপ্নের একটা সরকারি চাকরির আশায়। রোজ রোজ নতুন নতুন সার্কুলারে  ভিন্ন ভিন্ন অধিদপ্তর মন্ত্রনালয় থেকে শুরু করে সরকারি স্কুল-কলেজের পিয়নের পোস্টেও পরিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে অক্লান্তভাবে।
কিন্তু সামিয়ার সাথে যোগাযোগ করতে না পেরে হাসনাত মানসিকভাবে অনেকটা থমকে গেছে।কিন্তু সামিয়ার ব্যাপার কিছুটা ভিন্ন।মেয়েটি হাসনাতকে প্রচুর ভালোবাসলেও আশপাশের মানুষগুলোর সাথে লড়াই করে ভালোবাসার মানুষকে আগলে রাখার মতো সাহস তার নেই।সামিয়া তার এক বোনকে দিয়ে একটি চিঠি পাঠায় হাসনাতকে।চিঠি দিয়ে বলে দিয়েছে,’বলবি যেন চিঠিটা তোর সামনেই পড়ে’।
হাসনাত তার বাসার ছাদে দাঁড়িয়ে চিঠিটা পড়ছে।একটু দূরে দোলনাতে বসে আছে ইভানা।
চিঠিটা খুলে দেখে পড়তে লাগল হাসনাত।
চিঠিতে লেখা ছিল,
( হাসনাত,
সবকিছু আমি কিছুতেই মানিয়ে নিতে পারছি না।ক্ষণেক্ষণে মস্তিস্কের ভেতরটায় একটা তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করছি।মাঝে মাঝে আমার মনে হয় যেন নিশ্বাসটা কিছুক্ষনের জন্য আটকে যাচ্ছে।যোগাযোগ করার আর কোনো উপায় না পেয়ে তোমাকে চিঠিটা লিখলাম।প্লিজ কিছু একটা করো হাসনাত।আমি কোনোভাবেই পালিয়ে বিয়ে করতে পারবো না।কোনোভাবে দেখো আমার বাবাকে মানানো যায় কিনা।আর আমার কেন যেন মনে হয় যে উপর ওয়ালা আমাদের বিয়েটায় রাজি না,তাই এতসব ঝামেলা।বিয়েতে দাওয়াত রইলো।আর হ্যাঁ তোমার কিছু বলার থাকলে চিঠির প্রতিত্তোর লিখে ইভানার কাছে দিয়ে দিও।
ভাগ্যে কি আছে জানি না।শুধু জানি প্রচন্ড ভালোবাসি তোমায়।ভালো থেকো হাসনাত।
ইতি
তোমার সামিয়া )
হাসনাতের চেহারা লাল হয়ে গেছে চিঠিটা পড়ামাত্রই।কোনো চিঠি লিখেনি সে।খালি হাতেই ফেরত যেতে হয়েছে ইভানাকে।
২ দিন পর…
আজ হাসনাতের বাড়িতে অনেক লোক।সবাই সাদা-কালো পাঞ্জাবি পড়া।আগেরদিন রাতে হাসনাতের বাবা আইসিউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন।এই মর্মান্তিক সময়টায় হাসনাত এতটাই অসহায় আর মানসিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত যে বাবার চলে যাওয়ার কথা শুনে ছেলেটা আর একদম নিশ্চুপ হয়ে গেছে।পড়ন্ত বিকেলে দাফনকাফন শেষে সবাই চলে গেলে হাসনাত তার রুমে ঢুকে বুকফাটা কান্নায় জর্জরিত হয়ে পড়ে।হাসনাত গম্ভীর হয়ে কীসব চিন্তা করতে থাকে আর বারবার সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে বড় বড় নিশ্বাস নিতে থাকে,এভাবেই রাত অতিবাহিত করে।
কয়েকদিন পর…
আজ সামিয়ার বিয়ে।হাসনাতের বন্ধুরা সামিয়াকে জানিয়েছে বাবার মৃত্যুর পর হাসনাতকেও আর দেখা যায়নি বাহিরে।কিন্তু সামিয়া নতুন করে আর কিছু ভাবতে চাইছে না।সামিয়ার হবু বর সরকারি চাকরিজীবী নয়,কিন্তু মস্ত বড় এক ব্যবসায়ী।বেশ আয়োজন করেই সামিয়ার বিয়েটা হয়ে যায় শেষপর্যন্ত।
২ মাস পর…
হাসনাতের বাসার দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে কলিংবেল চাপছে তার বন্ধু রাকিব।হাসনাতের মা দরজা খুলে সালামের জবাব দেয়,
– ওয়ালাইকুম আসসালাম।কেমন আছো বাবা?
– জ্বী খালাম্মা ভালো,হাসনাত বাসায় আছে?
– না রে বাবা,ও তো কয়েকমাস যাবত বাসায় নেই।যাতায়াতে সমস্যা হয় বলে আজিমপুর সাবলেট নিয়ে থাকে ওর আরেক বন্ধুর সাথে।
– আচ্ছা খালাম্মা,ওর নতুন ফোন নম্বরটা দেন।
ফোন নাম্বার বলতেই বিদায় নিয়ে চলে গেল রাকিব।
এদিকে হাসনাত দিনরাত মনের বিরুদ্ধে অক্লান্ত সংগ্রাম করে বেঁচে থাকতে চাইছে বাস্তবতার প্রতিকূল স্রোতে।
৪ মাস পর…
শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে পড়ার টেবিলে বসে ঝিমাচ্ছে হাসনাত।সে এখন একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট।বেসরকারি একটি ব্যাংকের অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট অফিসার।মোটামুটি ভালোই স্যালারি। হঠাৎ হাসনাতের ফোনে বেজে উঠলো মেইলের সাউন্ড।
Dear Ibn Sayeed Hasnat ACA,
Congratulations! You’ve been selected for Oceanian Chartered Accountants Scholarship  in Australia.You are requested to submit the essential papers on our website.Thank You.
মেইলটা পড়া শেষ করতেই হাসনাত লক্ষ্য করলো, নিজের অজান্তেই তার চোখ বেয়ে পড়া কয়েক ফোঁটা জলে মোবাইলের স্কিনটা ঝাপসা হয়ে গেছে।হাসনাত ফোনটা নিয়ে মাকে কল দিয়ে জানালো সেই খুশির সংবাদ।কিন্তু এক অজানা কারণে হাসনাতের মনটা আরো বড্ড বেশি খারাপ হয়ে গেল।পরের সপ্তাহে ব্যাগপত্র গুছিয়ে হাসনাত চলে গেল মায়ের কাছে।
১ মাস পর…
হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর,ঢাকা।
বসার জায়গা থাকলেও হাসনাত দাঁড়িয়ে আছে ইমেগ্রেশন রুমের পেছনের দিকটায়।শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এই রুমটায় দাঁড়িয়ে হাসনাত অপেক্ষা করছে,ঠিক যেমন অপেক্ষা করতো নিলাচল,মৌমিতা,ঠিকানা নামক হরেকরকমের বাসে একটুমাত্র হাতলটা ধরে ঝুলে থাকার জন্য।কিন্তু আজ তাকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে ‘AirAsia Airlines’ এর একটি উড়োজাহাজের জন্য।
হাসনাত সিডনিতে মোটা অংকের মাইনেতে একটা চাকরি পেয়েছে।কোম্পানি থেকে তাকে দেওয়া হয়েছে মাত্র ২২০০ স্কয়ার ফিটের একটি ফ্লাট। পাশাপাশি নামীদামি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষনার সুযোগও পেয়েছে।এভাবেই কয়েকমাস চলে হরদমে।
মা আর হাসিব যেন একটু বিলাসবহুল ভাবে থাকতে পারে,তাই পুরোনো একতলা বাড়িটা ভেংগে নতুন বাড়ি করার জন্যে কয়েকলক্ষ্য টাকাও পাঠিয়েছে এই কয়েকমাসে।
নয় মাসের স্কলারশিপ প্রোগ্রাম শেষ হওয়ার পর হাসনাত প্রস্তাব পায় ঐ বিশ্ববিদ্যালয়েরই একজন নবীন শিক্ষক হিসেবে যোগদান করার জন্য।হাসনাতও অনেকটাই রাজি। বিড়বিড় করে ‘সরকারি চাকরি’ দুটো শব্দ বলেই মৃদুস্বরে হাসলো হাসনাত।হাসতে হাসতেই মাকে ফোন দিল।ফোনের ওপাশ থেকে মমতাময়ী একটা কন্ঠ ভেসে আসছে কানে,
-কিরে বাবা,কেমন আছিস?
-ভালোই মা।তোমার শরীরটা কেমন?
-আলহামদুলিল্লাহ বাবা।
-মা খুশির সংবাদ আছে।তোমাকে সামনের সপ্তাহেই টাকা পাঠাচ্ছি।হাসিবকে নিয়ে পছন্দ করে একটা গাড়ি কিনে ফেলো।তোমাকে আর কষ্ট করে সিএনজিতে করে এদিক-ওদিক যাওয়া লাগবে না।
-কি বলিস বাবা? বেতন কী বাড়ছে?
-না মা।নতুন চাকরি।আমার ভার্সিটিতেই লেকচারার পদে।
-আলহামদুলিল্লাহ বাবা।হাসনাত,ঠিকঠাক মতো খাওয়াদাওয়া করিস বাবা।
-আচ্ছা মা ঘুমাও।ভোরে মর্নিং ওয়াকে যেতে হবে।ফী-আমানিল্লাহ
– ফী আমানিল্লাহ মা।
সিডনিতে এভাবেই কেটে যায় ছয় ছয়টি বছর।
একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানের শেষে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে একটি শিক্ষনীয় গল্প বলতে থাকে হাসনাত।
গল্পের ইতি টানতে গিয়ে নিজের অজান্তেই হাসনাত একটি বাক্য বলে ফেলে,
(Remeber, God determines your fortune absolutely on your efforts and desires.)
সেদিন রাতে হাসনাত বাড়ির করিডরের পাশে বাগানের একটি ছাতার নিচে বসে আছে।আকাশে আজ তারাদের মেলা।চারপাশ খুব শান্ত।ঠিক তখনি দেশ থেকে ফোন এলো রাকিবের। ভালো মন্দ খোঁজখবর নেওয়ার পর জানালো যে আগামী মাসে কলেজের ‘গ্রান্ড রিইউনিয়ন’।শুরু থেকে ইমিডিয়েট সব ব্যাচের প্রাক্তনরাই আসছে প্রোগ্রামে।রাকিব হাসনাতকে রেজিস্ট্রেশন করার লিংক পাঠিয়ে দিল।কিন্তু হাসনাত সেই কাজটি করার আগে কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা গুনতে লাগলো।তারপর পকেটে থেকে একটা কাগজ বের করে অপর পৃষ্ঠায় কিছু একটা লিখতে লাগলো।
রেজিস্ট্রেশন করে ছুটির আবেদন আর টিকেট বুকিং করেই ঘুমিয়ে পড়লো হাসনাত।
১৫ দিন পর…
হাসনাত আজ ভোর চারটায় বাড়িতে এসে মাকে চমকে দিয়েছে।ছয়বছর পর মায়ের সেই আদর আর মমতা মিশ্রিত মুখটা যেন আগের মতোই রয়ে গেছে।মাকে জড়িয়ে ধরা মাত্রই মা অঝোরে কান্না শুরু করে দিল।হাসিবটা এখন অনেক বড় হয়ে গেছে।আইএসএসবি কোচিং করছে তিনমাস যাবত।স্বপ্ন তার ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনী’।
ছেলেবেলার বন্ধুদের সাথে দেখা হওয়ার পর,এলাকায় হাঁটাহাঁটি করার সময় কোনোভাবেই সে বিশ্বাস করতে পারছে না যে ছয়টি বছর সে এসবকিছু থেকে দূরে ছিল।বন্ধুমহলে হাসনাত এখন এক চমৎকার নামীদামী মানুষ।কিন্তু সবার মুখে একটাই কথা। ‘কিরে!এখনো বিয়ে করছিস না কেন?’
দেশে এসে হাসনাতের মনে হচ্ছে ছুটিটা আরেকটু বেশি নিলে ভালো হতো। বন্ধুদের সাথে একটু বেশি সময় কাটানো যেত।আবার কবে না কবে আসা হয় দেশে।
১০ দিন পর…
হাসনাত তার কলেজের বাহিরের মাঠে গাড়িটা পার্কিং করছে।ড্রাইভার সাথে নেই।কারণ আজ হাসনাতের রিইউনিয়নে আসার পেছনে অনেকগুলো উদ্দেশ্য নিহিত।
গাড়ি পার্কিং করেই অডিটোরিয়াম রুমের ভেতরে প্রবেশ করলো হাসনাত। বন্ধুদের সাথে আর তাদের রমনীদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করতে করতে ঘন্টাখানেক পাড় হয়ে গেল।কিন্তু এত ভিড়ের মাঝেও হাসনাত বারবার এদিকওদিক তাকিয়ে কিছু একটা খুঁজতে লাগলো। বিষয়টা তার এক বন্ধু খেয়ালও করে ফেলেছিল।হাসনাতকে এ ব্যাপারে তার বন্ধু জিজ্ঞেস করলে হাসনাত এড়িয়ে যায়।
বিকেলে প্রধান অতিথি ও অন্যাসব অতিথিদের বক্তব্য ও সংক্ষিপ্ত দোয়ার মাধ্যমে অনুষ্ঠানের এক পর্বের সমাপ্তি ঘটে।
সন্ধ্যা থেকে শুরু হয় ম্যাজিক শো,সংগীত,নাচ এসব।
হাসনাতের খুব ঘুম পাচ্ছিল।দেশে আসার পর রাতে ঠিকমতো ঘুম হয় না।তাই সে একাই উঠে বাফেট জোন থেকে কফি আনতে গেল।কফির লাইনে দাঁড়িয়েও এদিকওদিক তাকাতে থাকলো হাসনাত।কিন্তু হাসনাতের সামনের মহিলাটা কফি নিয়ে বের হওয়ার সময়ই দুর্ঘটনাবশত কফিটা পড়ে গেল হাসনাতের জুতোয়।আসলে ভদ্র মহিলার দোষ ছিল না।তার বাচ্চা হাত ধরে টান দেওয়াতেই এমনটি হয়েছে।নিচু হয়ে জুতোটা মুছতে লাগলো হাসনাত হাতের টিস্যু পেপার দিয়ে।
ভদ্রমহিলার কন্ঠে,
‘সরি ভাইয়া সরি।আম এক্সট্রেইমলি সরি।
নিচ থেকে মাথা তুলে দাঁড়াতেই বুকটা কেঁপে উঠলো সেই মুখখানি দেখে।শুকনো শরীরের ফর্সা মেয়েটার পড়নে একটি নীল বেনারসি।সামিয়াও হাসনাতকে দেখে হতভম্ব হয়ে গেল।
-হাসনাত !!!
-তোমার ছেলে?
-হ্যাঁ, তুমি দেশে ফিরলে কবে?
-না একেবারে না।৪০ দিনের ছুটি।
-অনেক বদলে গেছ তুমি।চল,ঐদিকটায় হাঁটি।
হাসনাত আর সামিয়া দুইজন দুইপাশে হাঁটছে।মাঝে সামিয়ার পাঁচ বছরের বাচ্চা অর্ক।
হাসনাত অনেকটা গা-ছাড়া কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
-তারপর,তোমার হাসব্যান্ড, সে রাগ করবে না?
-না সে অফিসের কাজে ব্যস্ত।আমি অর্ককে নিয়েই আসছি।
-ওহ আচ্ছা।
-আর তোমার?
-মানে?
-মানে তোমার জীবনসঙ্গিনী কোথায়?
-আমার প্রয়োজন নেই কাউকে।
কথাটা শুনে সামিয়া কিছুটা অবাক হয়ে গেল।সামিয়া ভাবছে, হাসনাত কী এখনো ভুলতে পারেনি ওসব স্মৃতি? একটা মানুষ এতগুলো বছর কীভাবে একা একপাক্ষিক অভিমান নিয়ে থাকতে পারে?
সামিয়ার কিছুই জানা নেই।
ঘন্টাখানেক কথাবার্তা হলো তাদের।সামিয়া সবকিছু বুঝতে পেরে কিছুটা লজ্জিত।সামিয়া তার ভুলগুলো বুঝতে পারছে আজ এতগুলো বছর পর।
অর্ককে ড্রাইভার এসে নিয়ে গেছে।গাড়িতে বসে ঘুমাবে এখন সে।
হাসনাত আর সামিয়া দুইজনই এখন নিশ্চুপ।দুজনই পায়ে পায়ে তাল মিলিয়ে হাঁটছে নিঃশব্দে।
আকাশটা আজ ভীষন মেঘলা।সামিয়ার মনটাও।সামিয়া মৃদু কন্ঠে বললো,
– হাসনাত,আমাকে ক্ষমা করে দিও প্লিজ।তোমার আমার সম্পর্কে হয়তো উপর ওয়ালার ইচ্ছে ছিল না।
– Remember, God determines your fortune absolutely on your efforts and desires. চাইলেই আরেকটু সময় নেওয়া যেত।তোমার সাথে শেষবার কথা হওয়ার দিন থেকে আমি আমাকে হারিয়েছি।তুমি চিঠিতে বলেছিলে,’নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল তোমার।’ তোমার সেই যন্ত্রনা ছিল ক্ষনস্থায়ী আর আমার ছিল দীর্ঘস্থায়ী। অবহেলা আর অবজ্ঞার দেয়াল পেরিয়ে এসে আমি তোমাকে খুঁজে পাইনি।আমার চারিপাশ ছিল অন্ধকার।আমি নিস্তব্ধ এক শক্তিতে বেঁচে ছিলাম বছরের পর বছর।আমার জীবনসঙ্গী_শূন্যতা।আমি শূন্যতম এক জগতে হারিয়ে যেতে চাই যেখানে হারানোর মতো আর কিছুই থাকবে না। তোমার চিঠির প্রতিত্তোর সেদিন লিখতে পারিনি।ক্ষমা করে দিও আমায়।এই কথাগুলোই প্রতিত্তোর হিসেবে ভেবে নিও। আর কখনো আমাদের দেখা হবে কিনা জানিনা। ভাগ্যে কী আছে সেটাও জানিনা, কিন্তু তুমিহীন আমি ভালো ছিলাম না।
Remember, God determines your fortune absolutely on your efforts and desires.
গুড বায় সামিয়া…
হাসনাত গাড়িতে উঠে পড়লো।সামিয়ার পৃথিবী কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেছে। বাতাসের বেগে সামিয়া দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না।রাস্তার দুপাশের লাল নীল রংবেরঙের বাতির আলোতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সামিয়ার চোখ দুটো এক অজানা মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে। হাসনাতের প্রস্থান দেখছে সামিয়া একচিত্তে।মঞ্চে উপস্থিত শিল্পীরা উচ্ছাসিত।  সুরে সুরে উল্লাসিত জনতার আনন্দধ্বনি। সবাই চিৎকার করে গাইছে…
আমায় ডেকো না ফেরানো যাবে না
ফেরারী পাখিরা কুলায় ফেরে না।


এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com