Logo
নোটিশ ::
আপনার যেকোনো সৃজনশীল লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের ঠিকানায়।আমাদের ইমেইল: hello.atharb@gmail.com

গল্প: মেঘে ঢাকা চাঁদ ─ মো. শাওন রহমান

অঙ্কন ডেস্ক / ৯৭ বার
আপডেট সময় : বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০

১.

প্রতিদিনের ন্যায় আজও পার্কের ঠিক কোনার বেঞ্চটায় মাথা নিচু করে প্রায় এক ঘন্টা ধরে বসে আছে দিয়া। কিন্তু ঈশানের আসার কোন নাম নেই। বারবার দিয়া ফোনে ট্রাই করে যাচ্ছে। কিন্তু ফোনটা সুইচ অফ। তার কিছুক্ষণ পরেই ঈশান এসে হাজির। দিয়া কোন কথা না বলে মুখ ঘুড়িয়ে বসে আছে। আর সে ও বারবার স্যরি বলার পরেও যখন দিয়া কোন কথা বলছে না, তখন ঈশানও চুপ হয়ে যায়। আর এভাবেই প্রায় আধঘন্টা কেটে যায়। অথচ দুজনেরই মনের মাঝে হাজারটা কথা জমে আছে। কথাগুলো বলার প্রস্তুতি নিয়ে এলেও পরিবেশটা আর স্বাভাবিক নেই। দুজনার মনেই ঝড় বয়ে যাচ্ছে। অবশেষে ঈশানই আবার কথা বলা শুরু করলো।

—- দিয়া তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে, আজ যা না বললেই নয়। অনেক চেষ্টা করেছি বলার কিন্তু বলতে পারিনি। তুমি কি আমার কথাগুলো শুনছো?
—- হুম।
—- আসলে দিয়া; মা আমাকে না জানিয়েই বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে।
কথাটা শোনা মাত্রই দিয়ার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। এই কথাটা সে কোনদিন কল্পনাতেও আনেনি। কিন্তু আজ বাস্তবে শুনতে হচ্ছে, তাও আবার ঈশানের মুখ থেকে। দিয়া এবার মুখ তুলে ঈশানের দিকে তাকালো। মেয়েটা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে আর ঈশানও মাথা নিচু করে বসে আছে।
—- তুমি কি বলেছো?
—- আমি কিছুই বলতে পারিনি। মায়ের কথার অবাধ্য আমি কখনোই ছিলাম না। আজ যদি বিয়েতে অমত করি তাহলে মা ভীষণ দুঃখ পাবে। বিয়ের কার্ড ও ছাপানো হয়ে গেছে। আমি মাকে দুঃখ দিতে পারব না আর না তোমাকে ছাড়তে পারব। এখন আমি কি করবো দিয়া?
—- বিয়েটা করে নাও।
—- তুমি এসব কি বলছো দিয়া?
—- হ্যাঁ, ঠিকই বলছি। বিয়েটা করে নাও।
—- তাহলে তোমার কি হবে?
—- আমাকে নিয়ে তোমার না ভাবলেও চলবে ঈশান।
—- কিন্তু…….!
—- আর কোন কিন্তু নয়, সবটা এখানেই ভুলে যাও তা তোমার এবং আমার দুজনের জন্যই ভালো হবে। ভালো থেকো।
ঈশানকে আর কোনকিছু বলার সুযোগ না দিয়েই এক দৌড়ে পার্কের গেটটা পার হয়ে রিক্সা ধরে চলে যায়।

২.

অনেক দিন ধরেই দিয়ার বাবা-মা মেয়ের জন্য পাত্র ঠিক করছে। কিন্তু মেয়ের মত না থাকায় অনেক ভালো ভালো সম্বন্ধও ভেঙে যাচ্ছে। প্রত্যেক বাবা-মা চায় নিজের মেয়েকে একজন সুপাত্রের হাতে তুলে দিতে। দিয়া অনেক ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নেয় যে, সে বিয়েটা করবে।
—- বাবা আমি তোমাদের পছন্দ করা ছেলের সাথে বিয়ে করতে রাজি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়ের সব ব্যবস্থা করো।
—- ঠিক আছে মা, তুই চাইলে আজই করবো।
—- ঠিক আছে।
দিয়ার যখন যা মনে আসে তাই করে। হুট করে যদি আবার না করে দেয়! এজন্যই দিয়ার বাবা চাইছিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়েটা দিতে। রবিনের মতো ছেলে খুঁজে পাওয়া বড়োই মুশকিল। কিন্তু মেয়ের বিয়েটা খুব ধুমধাম করে দেওয়ার শখ ছিল। একটাই মাত্র মেয়ে। কিন্তু তা আর হলো কোথায়।
সন্ধ্যায় আশেপাশে যেসব আত্মীয়স্বজন ছিল প্রায় সবাই উপস্থিত। খুব সাধারণ ভাবেই রবিনের সাথে দিয়ার বিয়ে হয়ে যায়।

৩.

রাত নয়টা পার হয়ে গেছে। ঈশান পাগলের মতো দৌড়াচ্ছে। রাস্তার সমস্ত মানুষ তার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু লক্ষ্য করবার মতো সময় তার কাছে নেই। তার যে আজ থামলে চলবে না। তাকে ছুটতে হবে, দিয়ার বিয়ে বন্ধ করতে হবে, দিয়াকে অন্য কারো হতে দেওয়া যাবে না। দুজনের বাসা খুব একটা দূরে নয় হেঁটে গেলে প্রায় পনেরো মিনিটের মতো লাগে। কিন্তু ঈশান সাত মিনিটের মধ্যেই দিয়ার বাসায় এসে উপস্থিত। বাড়ি ভরা লোকজন, সবাই আনন্দে মেতে আছে। ঈশান দেখলো দিয়ার বাবা সবাইকে মিষ্টি বিতরণ করছে। ঈশানের আর কিছুই বুঝতে বাকি রইল না। একবুক জমাট বাঁধানো কষ্ট নিয়ে সে হেঁটে চলেছে। চোখ দিয়ে অশ্রুজল বাধহীন ঝরে যাচ্ছে। নিজেকে তার বড়ই একা মনে হচ্ছে, খুব অসহায় লাগছে।

৪.

অনন্যা অনেকক্ষণ ধরেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই সে দিয়াকে একা পাচ্ছে না। কাজটা যতটা সহজ ভেবেছিল ততটা সহজ নয়। বড় একটা সমস্যায় পড়তে হয়েছে তাকে। তারপর একটু সাহস করে দিয়াকে সবার মাঝখান থেকে একটু দূরে নিয়ে এসে হাতে একটা চিঠি ধরিয়ে দেয়। আর বলে যে, ঈশান দিয়েছে। হৃদয়টা মোচড় দিয়ে ওঠে, নানান কৌতূহল তার মনে নাড়া দেয়। কেন সে আবার চিঠি দিতে গেলো! কি লেখা আছে এই চিঠিতে! পড়ার ইচ্ছে থাকলেও আর পড়া হয়ে ওঠেনা। বিদায় পর্ব শেষ হলে দিয়া রবিনের বাসায় চলে আসে। সূচনা হয় এক নতুন জীবনের।

৫.

আজ বাবা-মা দুজনেই বাসায় নেই। বাবার চেকাপ করাতে ড. মুনির চৌধুরী আঙ্কেলের চেম্বারে গিয়েছেন। আর রবিনেরও অফিস থেকে ফিরতে বেশ দেরি আছে। এটাই একমাত্র সুযোগ চিঠিটা পড়বার। তাই আর দেরি না করে। লাগেজ খুলে শাড়ির ভাজ থেকে চিঠিটা বের করে পড়তে শুরু করে।

আমার অখণ্ড ভালোবাসা দিয়া,
সবকিছু যে এতো তারাতাড়ি শেষ হয়ে যাবে সত্যি কোনদিন ভাবতে পারিনি। মাত্র একটা দিনের ব্যবধানে জীবনটা আজ উলোটপালোট হয়ে গেলো। ভাবছো এসব কথা কেন বলছি! তবে শোনো; সেদিন বাসায় ফিরে জানতে পারলাম সায়মা আপু আমার ডায়েরিটা পড়ে তোমার আর আমার বিষয়ে সব জেনে গেছে। এমনকি মা, বাবা, দুলাভাই সবাইকে জানিয়েছে। আমি হাজার কষ্ট পেলেও তাদের মতের কোনদিন বিরোধিতা করতাম না। এটা তারা জানতো তাই বিয়ের কার্ড ছাপানোর পরেও তোমার আর আমার সম্পর্কটা সবাই মেনে নিয়েছিল। আর এই খুশির খবরটা তোমাকে দেওয়ার জন্য অনেক বার তোমাকে কল করেছিলাম। কিন্তু তোমার ফোনটা বন্ধ পেয়েছি। তাই ভেবেছিলাম কাল তোমার ভার্সিটির পথে কথাটা বলবো। কিন্তু আজ যখন তোমার বান্ধবী অনন্যা আমাকে ফোন করে বললো তোমার বিয়ের কথা। তখন সাথেসাথে আমি তোমার বাসার দিকে দৌড় দেই। অবশেষে তোমার বাসার মেইনগেট থেকে দেখতে পেলাম, তোমার বাবা সবাইকে মিষ্টি বিতরণ করছে। তখন আর চাইনি তোমার নতুন জীবনে বাঁধা সৃষ্টি করতে, তাই ফিরে এসেছি। সবশেষে শুধু একটা কথাই বলবো, আমি তোমাকে অনেক অনেক ভালোবাসি দিয়া! আমার হৃদয়ে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তোমার জন্য ভালোবাসা থাকবে। ছুঁয়ে থাকার বাহিরে এক শুভ্র ভালোবাসা। ভালো থেকো দিয়া।
ইতি,
তোমারই ঈশান।

হঠাৎই কোন এক শূন্যতায় বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। গাল বেয়ে পড়া কয়েক ফোটা জলে ভিজে যায় ভালোবাসার শেষ পত্রখানা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com