Logo
নোটিশ ::
আপনার যেকোনো সৃজনশীল লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের ঠিকানায়।আমাদের ইমেইল: hello.atharb@gmail.com

গল্প: আহারে জীবন || সামিয়া চৌধুরী

অঙ্কন ডেস্ক / ৩১৩ বার
আপডেট সময় : শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

 

 

আমি তিতলি। আজ আমার এস.এস.সি পরীক্ষার ফলাফল দিবে। বাসার কেউই তেমন চিন্তা করছে না। ওরা জানে যে আমি অনেক ভালো ফলাফল করব। তাদের সবার অনেক স্বপ্ন আমাকে নিয়ে। মস্ত বড় ডাক্তার বানাতে চায় আমাকে। আমি স্কুলের সব পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করতাম। শিক্ষক, বাবা, মা, আত্মীয়রা সবাই ধরে নিয়েছেন যে এই বারও আমি GPA-5 পাব। কিন্তু… কিন্তু আমি জানি এইবার আর এমন হবে না।আমার ইংরেজি পরীক্ষাটা খুব খারাপ হয়েছিল যদিও প্রশ্নটা খুব সহজ হয়েছিল।প্রশ্ন হাতে পাওয়ার পর কিছুই লিখতে পারিনি।বসে বসে কান্না করতেছিলাম। প্রশ্ন সব মুখস্থ ছিল কিন্তু একটি উত্তরও মাথায় আসতেছিল না। সেইদিন নিজেকে খুব অসহায় লাগছিল। আর আশ্চর্যের বিষয় হল আমি কিছুই বানিয়ে বানিয়ে লিখতে পারছিলাম না। প্রশ্ন হাতে পাওয়ার পর থেকেই স্যারের সেই কথা গুলা বারবার কানে বাজতেছিল-” তোমার লজ্জা থাকলে তো তুমি স্কুলে আসতে না”! মাছির ভন ভন আওয়াজের মতো বাক্যটা বারবার মাথায় দোল খাচ্ছিল।আমি কিছুই লিখেতে পারিনি সেইদিন!

দুপুর ১২.০০টার সময় বাবা বিতুলকে (আমার ছোট ভাই) স্কুলে ফলাফল জেনে আসার জন্য পাঠালেন। সে গম্ভীর মুখে ঢুকে বলল যে আমার GPA-0.00। বাবা বিতুলের কথা বিশ্বাস না করে নিজেই চলে গেলেন বাজারে, আমার ফলাফল দেখার জন্য। প্রায় ১ ঘন্টা পরে বাবা আসলেন। আমার সব বিষয়ে ৮০+ মার্কস শুধু ইংরেজিতে আমি ফেল। এরই মধ্যে আত্মীয় স্বজনরা ফোন দিতে শুরু করে দিয়েছে। সবাই আমাকে স্বান্তনা দিতে লেগে গেল। আমাদের যে এত আত্মীয় আছে তা ভেবেই আমি অবাক হচ্ছিলাম। যাদের সাথে আগে কোনদিন দেখা হওয়া তো দূরের কথা কোনদিনই কথা হয় নি আজ তারা কথা বলছে, আমাকে স্বান্তনা দিচ্ছে।

 

রাতে হঠাৎ বাবার ঘরে গেলাম।বাবা লাইট বন্ধ করে শুয়ে আছেন। আস্তে আস্তে বাবার ঘরে গেলাম। মা স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন। আজ তো আমার শেষ দিন। বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম।বাবা উঠে বসলেন।দেখে মনে হল শরীরে শক্তি নেই। আমাকে স্বান্তনা দিয়ে বললেন “ওরা নিশ্চয়ই কোন ভুল করেছে মা।আমি কাল শহরে গিয়ে আমার এক পরিচিত বন্ধুর সাথে কথা বলব। ওরে বললেই সব ঠিক হয়ে যাবে রে মা। তুই যা মা, ঘুমিয়ে পড়।”আমি আমার রুমের দরজা-জানালা বন্ধ করলাম। একটা ছোট বক্স বের করলাম।আমি স্যারের কাছে থেকে কথাটা শুনার পর থেকে ২/৩ট করে ঔষধ কিনে রাখতাম। ঠিক করে রেখেছিলাম যেদিন আর এসব কষ্ট সহ্য করতে পারব না সেইদিন….

সবগুলো ঔষধ বিছানায় উপুড় করে ফেললাম।১,২,৩…৮৩ হলো। আবারও গুনলাম। কিন্তু আবার ৮৩।পানি আনার জন্য টেবিলের কাছে গেলাম।হঠাৎ মনে হলো সব লিখে রাখলে কেমন হয়?
….. সেদিন স্যার ইংরেজি পড়াচ্ছিলেন। আমাকে কেন জানি উনি একটু বেশিই আদর করতেন।আমার পড়া রোজ ধরতেন, প্রতেকদিন আমার homework check করতেন।আমিও রোজ পড়া শিখে যেতাম।স্যার পড়াচ্ছিলেন।হঠাৎ পিছন থেকে আমাকে কে যেন ডাকল।রকি আমাকে ক্ষেপানর চেষ্টা করছে। বারবার এমন করছে ও।হঠাৎ খুব রাগ উঠল। বললাম -“এরেকবার এমন করলে স্যারের কাছে বলে দিব।”আর…আর এই কথাটা স্যার শুনে ফেললেন।পড়া ধরালেন।ঠিক তখন কি হয়েছিল জানি না কিন্তু কোনো কিছুই পারলাম না।হায়রে দুনিয়া!একবার..মাত্র একবার পড়া না পারার জন্য স্যারের সব রাগ যেন আমার উপর এসে পড়ল। বললেন ক্লাস শেষে আমি যেন স্যারের সাথে দেখা করি।চুপচাপ বাকি ২০ মিনিট ক্লাস করলাম।যাবার সময় স্যার আমাকে ডাক দিয়ে নিয়ে গেলেন।
হ্যাঁ আমাকে, শুধু আমাকে।রকিকে নয়।আমি যেন পাপের সমুদ্রে ডুবে আছি। স্যারের চোখে চোখ রাখতে পারছিলাম না,নিচের দিকে তাকিয়ে আছি।”স্যার, রকির এক বন্ধু নাকি আমাকে পছন্দ করে।আমি না করে দিছি স্যার।আর আমি চাই না স্কুলে কেউ জানুক ওর কথা।কিন্তু রকি…”বাকিটা না শুনেই স্যার বললেন- “তোমার লজ্জা থাকলে তো তুমি স্কুলে আসতে না!”কথাটা শুনার পর থেকেই খুব কষ্ট হচ্ছিল।ক্লাসে চলে আসলাম।ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল আমার। কারও কাছে বলতে পারছিল আবার সহ্য ও করতে পারছিলাম না।
লিখাটা শেষ করার পর মনে হলো ভালো লিখতে পারিনি। আমার ডাইরি লিখার অভ্যাস নেই।পেইজগুলো ছিঁড়ে ফেললাম।গ্লাসটা হাতে নেয়ার পর মনে হল কি হবে সবাইকে জানিয়ে? কেউই তো বিশ্বাস করবে না।বরং অনেক দূরে চলে গেলেই তো হয়।হ্যাঁ, আমি চলে যাব অনেক দূরে। অনেকগুলো ঔষধ হাতে নিয়ে মুখে দিলাম।বাকিগুলো ও খেয়ে নিলাম।মাথাটা হঠাৎ কেমন যেন করতে শুরু করল।হাত থেকে গ্লাসের বাকিটা পানি বিছানায় পরে গেল।বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলতে ইচ্ছা করছিল -“বাবা দেখ আজ তুমার মেয়ে অনেক খুশি।আর কেউ কোনোদিন আমার দিকে অপরাধীর মতো তাকাতে পারবে না বাবা।আমি মুক্তি পেতে যাচ্ছি বাবা…”

  • গল্পের ‘আমি’ তো মুক্তি পেয়ে গেল কিন্তু বাস্তবের ‘আমি’ মুক্তি পাবে কবে?

 

 

 


এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com