Logo
নোটিশ ::
আপনার যেকোনো সৃজনশীল লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের ঠিকানায়।আমাদের ইমেইল: hello.atharb@gmail.com

ডিপ্রেশন ও একটি মৃত্যু— ২য় পর্ব || ফাতেমা আকন পিউ

অঙ্কন ডেস্ক / ৪৫০ বার
আপডেট সময় : মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২০

বাবা, মা , বড় ভাইকে নিয়ে রাফসানের পরিবার। চারজনের এই পরিবারে রাফসান ছোট। সাধারণত পরিবারের ছোট ছেলে মেয়েরা থাকে সবার আদরের। ছোট ছেলেকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন থাকে বাবা মায়ের। তাদের যত্ন স্নেহ থাকে বড় সন্তানদের তুলনায় বেশি। কিন্তু রাফসানের ক্ষেত্রে তার উল্টো। ছোটবেলা থেকেই তার সাথে চলে অন্য রকম আচরণ। এক সাথে দুই ভাই খেতে বসলে রাফসানের পাতে কখনোই ভালো খাবার আসে না। বড় ভাই রাহাত যা ইচ্ছে করতে পারে, নিজের মনের মতো করে সব করতে পারে। কিন্তু রাফসান! তার ক্ষেত্রে সব উল্টো। নিজের বলে তার কি আছে? বাবা তার নয়, মা তার নয়, ভাই তার নয়। এক পরিবারের সন্তান হয়ে সে একজন চাকর। পড়তে বসলে নানা সমস্যা। বাবা এসে টিভি ছেড়ে দিবেন। মা এসে বকাবকি করবেন। তাও সব মেনে নিয়ে রাতের অন্ধকারে বারান্দায় মোমবাতি জ্বালিয়ে লুকিয়ে পড়তে হয় তাকে। তার এমন পড়ার সাফল্য দেখে রেগে উঠেন বাবা মা। আর এবার! মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় সামান্য বাজার আনার কথায় রাজি না হওয়ায় রাফসানের বাবা তৌকির সাহেব ছেলের বইয়ের পাতা ছিঁড়ে জ্বালিয়ে দেন। সেই সময় আড়াল থেকে রাফসানকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করছিলেন তার মা শাহানাজ বেগম। এসবের পরও হাল ছাড়ে নি রাফসান। আশ্চর্যের বিষয় হলো যে ছেলেকে বাবা মা সহ্যই করতে পারেন না তার নামে এতো বড় বাড়ির নাম করণ করা হলো!! রাফসান ভিলা। পাঁচ তলা এই বাড়ির নাম রাফসান ভিলা। সেই রাফসান যার ছায়াও কেউ সহ্য করতে পারে না। লোকমুখে প্রচলিত আছে যখন রাফসানের জন্ম হয় তখন এই বাড়ি তৈরি করা হয়। তাই রাফসানের নামেই দেওয়া হয় এই বাড়ির নাম রাফসান ভিলা। এমন কি ঘটলো যার জন্য সেদিনের আদরের রাফসান আজ বাড়ির চাকরের সমান??

হাত দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে কলিংবেল চাপে রাফসান৷ পরনের শার্টটা ঘামে ভিজে আছে৷ মাথার চুল গুলোতে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে। বাইরে আজ প্রচন্ড রোদ। আর এই রোদের মধ্যে পায়ে হেঁটে বাসায় পৌঁছেছে রাফসান। পকেটে তার একটা পয়সাও নেই। খালি হাতে গিয়েছিল রেজাল্ট আনতে। বেশখানিকটা সময় পর শাহানাজ বেগম দরজা খুলেন। মাকে দেখে এক প্রাণ ভরা হাসি দেয় রাফসান। কিন্তু তার মায়ের চোখে মুখে ছিল বিরক্ত ভাব। নাক ছিটকে তিনি রাফসানকে বলেন,

” ছিঃ তোর গায়ের দুর্গন্ধে আমার গা গোলাচ্ছা। যা এখন তুই ঘরে ঢুকবি না। তোর জন্য আমার ঘরে মাছি আসছে। ”

মায়ের এমন কথা শুনে কিছুটা মন খারাপ হয়ে যায় রাফসানের। কিন্তু এসব সে গায়ে না মেখে মুখে হাসি নিয়ে বলে,

” মা আমি তো বাইরে থেকে এসেছি। বাইরে অনেক রোদ। রোদে হেঁটে এসেছি তাই ঘেমে গিয়েছি। কাপড় পাল্টে গোসল করে নিবো। সব ঠিক হয়ে যাবে। ”

” ইশ!!! কাপড় পাল্টে গোসল করে নিবো, তা নবাবজাদা কি আমাকে তার চাকরানী পেয়েছে নাকি যে সে কাপড় পাল্টে নিবে আর আমি তা ধুয়ে দিবো? যা এখান থেকে। এখন তুই ঘরে আসবি না আমার রাহাতের বন্ধুরা এসেছে। ”

রাফসানকে আর কোনো কথা বলতে দেওয়ার সুযোগ না দিয়েই তিনি তার মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেন। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে রাফসান। কি করবে সে? এখানে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে? আর দাঁড়িয়ে থাকলেই কি তার ঘাম, ঘামের দুর্গন্ধ সব চলে যাবে? ডান হাত দিয়ে নিজের পেট চেপে ধরে। বড্ড খিদা পেয়েছে তার। সকালে এক পিস শুকনো পাউরুটি খেয়ে গিয়েছিল সে। আর এখন ঘড়িতে দুপুর তিনটে বাজে। খিদের জ্বালায় চোখে ঝাপসা দেখছে সে। দেয়ালের সাথে হেলাম দিয়ে সিঁড়িতে বসে পড়ে সে।

হাতে দুটো লাগেজ নিয়ে উপরে উঠছেন রাফসানের মামা আসরাফ সাহেব। ব্যবসায়ীক কাজে তিনি কিছুদিনের জন্য দেশের বাইরে ছিলেন। উপরে উঠার সময় তিনি দেখেন রাফসান সিঁড়িতে চোখ বুজে বসে আছে। তার সমস্ত শরীরে ঘাম। তাকে দেখে বোঝা যাচ্ছে সে বেশ ক্লান্ত। ধীরেধীরে আসরাফ সাহেব রাফসানের কাছে যান। হাতের লাগেজ রেখে হাত বুলিয়ে দেন রাফসানের মাথায়। তার চুলের ঘামে ভিজে যায় আসরাফ সাহেবের হাত। মাথায় কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে হকচকিয়ে উঠে রাফসান। পাশে মামাকে দেখে তার সেই প্রাণ ভরা হাসি দেয়। এই মামা আর মামার পরিবার ছাড়া কেউ তাকে ভালোবাসে না এতোটা। এ কদিন মামা ছিলেন না তার যেন প্রাণটাই ছিল না।

রাফসানকে এভাবে বসে থাকতে দেখে আসরাফ সাহেব জানতে চান সে কেন এখানে বসে আছে। জবাবে সে বলে বাসায় কিছু মেহমান এসেছে আর তার রেজাল্ট তেমন ভালো হয় নি তাই সে এখানে বসে আছে। মামাকে মিথ্যা বলতেও গলা ধরে যায় রাফসানের। কিন্তু কি করার আছে তার। নিজের পরিবারকে ছোট করতে চায় না সে। তাই তো এতো কিছু ঘটে যাওয়ার পরও একই বিল্ডিংয়ে থাকা মামা কিছুই জানেন না। শুধু মামা নয়, মামাতো ভাই মামী কেউ জানে না এ বিষয় নিয়ে। কারণ রাফসান চাপা স্বভাবের। সে তার কথা নিজের মাঝেই রাখে। যতই হোক তার পরিবার। তার রক্ত। কিভাবে পারবে সে তাদের ছোট করতে?
রাফসানকে নিয়ে নিজের ঘরে যান আসরাফ সাহেব। সবাইকে না জানিয়েই তিনি হুট করে চলে এলেন। জানতে পারলে উনার ছেলে সাদী যেতো এয়ারপোর্টে। রাফসানকে এই অবস্থায় দেখে সাদী নিজের রুমে নিয়ে যায় তাকে। সেখানে গোসল করে কাপড় পাল্টে নেয়। তার ঘামে ভেজা কাপড় গুলো মামী নিজের ছেলের কাপড়ের সাথে এক করে নিয়ে ধুয়ে দেয়। রাফসান মানা করলেও তিনি বলেন, ” ছেলে কি একটা আমার? তুমিও তো আমার ছেলে।” কথাটা বারবার কানে বাজতে থাকে রাফসানের। তার নিজের মা, যার নাড়ী ছেঁড়া ধন সে তার কাছে কোনোদিন একটু নরম গলার কথা শুনতে পায় নি। মনে নেই কবে মা বুকে টেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু মামী! নিজের ছেলেকে যেভাবে আদর যত্ন করেন ঠিক তেমনি তাকেও।

কথায় আছে রক্তের সম্পর্ক বড় সম্পর্ক। কিন্তু মাঝে মাঝে রক্তের সম্পর্ক থেকে আত্মার সম্পর্ক অনেক বেশি হয়ে দাঁড়ায়। এক অনাথকে অনেক সময় মানুষ করলে সে তাদের জন্য জীবন দিয়ে দেয়। আবার অনেক সময় নিজের রক্তের ছেলে খোঁজ খবর নেওয়া তো দূর, পারলে জীবন নিয়ে নেয়। এই সম্পর্ক জন্মজন্মান্তরের। চাইলেও কেউ তা বিচ্ছেদ করতে পারে না।


এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com