Logo
নোটিশ ::
আপনার যেকোনো সৃজনশীল লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের ঠিকানায়।আমাদের ইমেইল: hello.atharb@gmail.com

কাজী আব্দুল হালিম সানী’র গল্প ‘অন্ধকারের ঘ্রাণ’

অঙ্কন ডেস্ক / ৩১৩ বার
আপডেট সময় : বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২০

চুমকি হাই তুলতে তুলতে ঘুম থেকে উঠলো। আবারো কাক ডাকা ভোর। কাক ডাকা ভোরের একটা তীব্র ঘ্রাণ আছে। সেই ঘ্রাণ চুমকি পায়। একটা স্নিগ্ধ বাতাস চুমকি কে অনেক প্রৌঢ় করে তলতে লাগলো। চুমকি  নিত্যদিনকার মতো বস্তা নিয়ে হাটা শুরু করলো। কিছুদূর হাটতেই রবি ডাকতে লাগলো।
রবি, কিরে এত দৌড়াইয়া হাটতেছস কেরে?
চুমকি বিরক্ত হয়ে বললো, তাতে তোর কি?
রবি, রাগস কেরে?
দুজনেই ঝগড়া শুরু করলো।
দুজনের সামনে দিয়ে তখন তাদের বয়েসী একটি মেয়েকে নিয়ে তার মা স্কুলে যাচ্ছে। মেয়েটির বয়েস ১০ হবে। মেয়েটির পিছনে সুন্দর ব্লু কালারের একটি ব্যাগ। সে আপেল খাচ্ছে। অর্ধেক খেয়ে ফেলে দিলো। মেয়েটি চলে যাওয়ার পর রবি আপেল টি কে নিজের বসে আনলো।
রবি, আয় আমরা এইটা দু ভাগ কইরা খাই।
চুমকি, কি দিয়া করবি দুই ভাগ?
রবি, দাত দিয়া।
বলেই সে হেসে কুটিকুটি।
রবি, নে তুই আগে খাইয়া নে। পরে আমি খামু। হুন খবরদার বেশি খাবি না। অর্ধেক টা খাবি।
চুমকি, না তুই খা আগে।
রবি কেই খেতে হলো অর্ধেক টা। চুমকিকে অর্ধেকটা দিলো। কিন্তু সে খেলো না কি মনে করে তার নোংরা স্কাটে গুজে রাখলো।
রাস্তায় হাটাহাটি করতে করতে বিকেল হয়ে গেলো। চুমকির ফেরার সময় হলো।
এসে দেখলো তার ছোট বোন রোকেয়া টা কাঁদছে। রোকেয়ার খুব জ্বর কিন্তু চিকিৎসা করতে পারছে না। তার অর্ধেকটা আপেল রোকেয়া কে দিলো।
রোকেয়ার অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। সে আপেল টা হাতে নিয়ে দূরে পানিতে ফেলে দিলো। তার চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। চুমকি অন্যমনস্ক হয়ে গেলো।
কি দোষ করেছিলো এই ১০/১২ বছরের মেয়েটা। ৬ বছরের একটা মেয়েকে তার ঘাড়ে দিয়ে বাবা মা পালালো । অবশ্যি এমন বাবা মা থাকলে অশান্তি টাই বেশি। প্রতিদিন ঝগড়া করবে আর মার খেতে হবে দুই বোনকে। তাদের যন্ত্রণা মুক্তি করে দিয়ে পালাক্রমে বাবা মা বিদায় হলো।
সন্ধা ঘনিয়ে রাত হলো। কড়া অন্ধকারের ঘ্রাণ চারপাশে ছড়িয়ে পড়লো। ছোট্ট রোকেয়া বোন কে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো।
গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো। রাস্তায় অনেক গাড়ি যাচ্ছে, হর্ন দিচ্ছে। কিন্তু রোকেয়া উঠবে না। তাদের হর্নের শব্দ শুনা মানা। আর ক্ষুধা নিবারনের একটি কার্যকরি উপায় হলো ঘুম। এটি চুমকি ৪ বছর বয়েস থেকেই শিখে যায়। চুমকির ঘুম এলো না। চুমকি রোকেয়ার মাথায় হাত দিলো দেখলো জ্বর আরো বেড়েছে। আহারে! বোনটির কি ধৈর্য্য একটু যন্ত্রণাও করছে না। চুপটি করে ঘুমিয়ে আছে।
সকালে চুমকি ডাক্তার দোকানে যাওয়ার আগেই গিয়ে বসে রইলো। কিছুক্ষণ পর ডাক্তার এলো।
চুমকি, স্যার, আমার বইনটার খুব জ্বর কিচ্ছু খাইতে পারে না স্যার। একটা বড়ি দিবেন আমার বইন টারে?
ডাক্তার কিছুক্ষণ লিখালিখি করে বললেন,
দে একশ টাকা বের কর। ঔষধের দাম একশ টাকা।
চুমকি, স্যার, আমার কাছে ত কোনো টাকা পয়সা নাই। যদি এই গরিব রে দয়া করতেন।
এই টোকাই যা ভাগ! সকাল সকাল ঝামেলা করিস না। ঔষধ নিলে টাকা নিয়ে আসিস। আমার এমনিতেই ব্যবসায় মন্দা চলছে।
চুমকি গিয়ে পায়ে ধরে ফেললো।
চুমকি, স্যার একটু দয়া করেন,,,
ডাক্তার ওকে লাথি দিয়ে মেঝেতে ফেলে দিলেন।
এক বুক কষ্ট নিয়ে সে রাস্তায় হাটছে। কি অদ্ভুত ব্যাপার তার চোখ দিয়ে এক ফোটাও পানি আসছে না।
সামনে রবিকে দেখা যাচ্ছে। সে সিগারেটে টান দিচ্ছে আর ধোঁয়া গুলো আকাশে ছাড়ছে।
রবি, দেখলি ছুমকি। আমি কেমুন সাহেব গো মতন চুরুট টানি।
চুমকি, চুরুট পাইলি কই?
রবি, তা দিয়া তর কাম কি নে টান দে একটা!
চুমকি, না টান দিমু না আগে ক কই পাইলি?
রবি, এক লোক বইসা বইসা পত্রিকা পড়তেছিলো আর চুরুট খাইতাছে আমি গিয়ে নিয়ে দৌড় দিলাম। হে কইতেই পারে নাই হা হা হা হা,,
চুমকি, তুই আরেকজন চুরুট নিয়া আইছস। তর চুরুট খামু না।
চুমকি রাস্তায় হাটছে।
রবি মনে মনে বলছে, শালীর দেমাক দেহো!
চুমকি তার বাদল চাচাকে ( এই বস্তিতেই থাকে বলে চাচা ডাকে) বললো তার বোনের শরীর খারাপ ঔষধ লাগবে।
বাদল চাচা, দেখ বুঝলাম সবতা। অহন টাকা ত আমার কাছেই নাই তবে তুই তোর চাচীর কাজ গুলা কইরা দে। দেহি কি করা যায়। ডেগ ডেগচি মাইঞ্জা দে।
চুমকি সারাদিন কাজ করলো। শরীর আর দিচ্ছে না। তাকে ২০ টাকার একটি নোট আর কিছু বাশি খাবার দিয়ে বললো, টাকা পয়সার অনেক অভাব বুঝছস? নিয়া নে এগুলাই।
চুমকি কিছুই বললো না।
সে এসে দেখলো রোকেয়ার অবস্থা আরো খারাপ। জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে গা। চুমকি ভাত মেখে রোকেয়ার মুখে দিচ্ছে। রোকেয়া খেতে পারছে না। খুব কষ্ট হচ্ছে।
রোকেয়া, বইন আমি কি মইরা যামু?
চুমকি, না বইন তরে আমি মরতে দিমু না। এমন কথা আর কইস না।
রোকেয়া, তুই সারাদিন বাইরে বাইরে থাকস আমার একলা একলা ভালা লাগে না রে। খুব ডর করে। এই বুঝি মইরা গেলাম। হুন, তুই সারাদিন আমার পাশে বইসা থাকবি তোর কোনো জায়গায় যাউন লাগব না।
চুমকি, আমি না গেলে খাইবি কি বইন? তোর চিকিৎসার লাগি টাকা কই পামু?
রোকেয়া কিছু না বলে বোন কে জড়িয়ে ধরলো।
নিজের বোনকে জড়িয়ে ধরার মাঝে যে সুখ তা হাজার পদ ভালো খাবার খেলেও হয় না।
চুমকি দীর্ঘশ্বাস ফেললো। মনে হচ্ছে সে যদি মারা যেত তাহলেই বেঁচে যেত। তখন বোনের কি হত??
না না মরলে চলবে না।
কালো দীঘিটার পাড় দিয়ে চুমকি হাটছে। যখন তার খুব চিন্তা থাকে মাথায় তখন সব ভুলে গিয়ে এই দীঘির পাড়ে হাটে। তখন সব ভুলে যায়।
তার চোখ সামনে যেতেই থমকে দাঁড়ালো সে।
রবিকে কিছু লোক হাত পা বেধে মারছে। রবি চুমকির দিকে তাকিয়ে বললো, ছুমকি আমি চুরি করি নাই রে। আমারে অযথা মারতাছে। তুই ভয় পাইস না। আমার কিছু হইব না। মারে কইস না কইলাম।
চুমকির চোখ ভর্তি পানি এলো। মার খাচ্ছে রবি পানি কেনো তার চোখে আসবে?
রবির জন্যে তার কিসের টান? রবি কি আসলেই চুরি করেছে?
চুমকির একদম বিশ্বাস হচ্ছে না। আসলে টোকাই হলে যা সহ্য করতে হয়। আচ্ছা চুমকি কি এখানে থাকবে? রবিকে মারার পর তো সে একা যেতে পারবে না। পরক্ষণেই তার বোনের কথা মনে হলো। রোকেয়ার জ্বর খুব বেড়েছে। কিছু একটা করা দরকার। চোখের সামনে বোন টা বিলীন হয়ে যাবে এ কী ভাবা যায়! এর চেয়ে আরো বেশি যন্ত্রণাও যদি সহ্য করতে হতো চুমকির সমস্যা ছিলো না। কিন্তু তার বোন টি যেনো ভালো থাকে। সুখ কি এমন এক জিনিস! কেনো সুখ কে পাওয়া যায় না। সুখে থাকার সবচেয়ে বড় একটা উপকরণ হলো অর্থ। তাই সুখ কে পাওয়া দায়।
রোকেয়া কথা বলতে পারছে না। শুধু তাকিয়ে আছে চুমকির দিকে। আর চোখ থেকে পানি ঝরছে। চোখ বড় বড় করে এখন তাকাচ্ছে রোকেয়া।
চুমকি তার শিউলি খালার কাছ্র গেলো। কিছু টাকা চাইলো কাজ করার বিনিময়। কিন্তু খালার বাসায় কাজের মেয়ে আছে। তাই কাজ করতে দিলো না। বারবার চাইলে তাকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়।
চুমকি হাটছে। তার মাথায় সমস্ত আকাশ যেনো গলে পড়ে গেলো। তার বোনটি কি মারা যাবে? না, কোনোভাবেই বোন কে মরতে দেওয়া যাবে না। কিছু একটা করতেই হবে।
চুমকি দৌড়ে গেলো বাদল চাচার কাছে।
চুমকি, চাচা আমার বইনটা মইরা যাইতাছে। যদি কিছু সাহায্য করতেন।
বাদল চাচা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে চুমকির দিকে। চুমকি মাথা নিচু করে ফেললো।
বাদল চাচা, আইচ্ছা দিমু আয় ঘরে আয়।
চুমকি ভেতরে গেলো। দেখলো তার চাচীও নেই ঘরে পুরো ঘর খালি।
চুমকি, চাচা খালি ঘরে কি করমু যদি কিছু টাকা দিতেন তাইলেই চইলা যাইতাম।
বাদল চাচা, টাকা দেওয়ার লাগিইত ঘরে আনলাম। বুঝছস না কেন?

আজ চাঁদনী রাত। চাঁদের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠলো একটি অপরাধী মুখ। চুমকি হাটছে। তার হাতে একশ টাকার একটি নোট। মুখ টা ফ্যাকাসে। একটু আগে তার সাথে যা হয়েছে তা কাউকে বলতে পারবে না। সে শুধু দ্রুত হাটছে।
তার পা বেয়ে রক্তবিন্দু ফোটায় ফোটায় পড়ছে। রক্তবিন্দুগুলো স্রষ্টা কে বলছে, আমাকে এত কিছু সহ্য করতে হবে কি জন্যে?
তখন অদৃশ্য শব্দ আসবে, সব সহ্য করতে হবে কারণ তুই পথশিশু।


এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com