Logo
নোটিশ ::
আপনার যেকোনো সৃজনশীল লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের ঠিকানায়।আমাদের ইমেইল: hello.atharb@gmail.com

মাহবুবা স্মৃতি’র গল্প ‘মাতৃত্ব’

অঙ্কন ডেস্ক / ১১৯ বার
আপডেট সময় : সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২০

 

বিয়ের রাতেই আমি ছয়মাসের এক বাচ্চার মা!অবাক হলেও এটাই সত্য!বাসর ঘরে সেজেগুজে আমি যখন আমার বরের অপেক্ষা করছিলাম আর মনে মনে অনেক স্বপ্ন বুনছিলাম বিয়ের প্রথম রাত কেমন হবে!আর ঠিক সেই সময় আমার বর এক বাচ্চা নিয়ে ঘরে প্রবেশ করেন।আমি অবাক হয়ে আমার বরের দিকে তাকাই..
আমার বর বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে বিছানার এককোণে বসে থাকে।অনেকক্ষণ কিছু বলেনা,আমি জিগ্যাসু দৃষ্টি নিয়ে বরের দিকে তাকিয়ে থাকি।অবশেষে আমার বর যা বলে,তারজন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলামনা।আমি নাকি আজ থেকে এই বাচ্চার মা!সেদিন আমি যতোটানা কষ্ট পেয়েছি,তারথেকেও বেশি ক্ষোভে ফেটে পরেছিলাম!সতীনের ছেলেকে কিনা আমার মানুষ করতে হবে!বাবামার উপর খুব রাগ হয়।আমার বাবামা কিনা আমাকে বউ মরা ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিলো!যার কিনা ছয়মাসের একটা ছেলেও আছে!অথচ আমাকে কেউ কিছুই জানালোনা আগে!নিজের নতুন বরকে যেমন স্বার্থপর মনে হলো,তেমনি বাবামাকেও মনে হলো এমন বাবামা না থাকলেই ভালো হতো!
বাসরঘরে আমি একবার আমার বরের দিকে ,আরেকবার তাকাই ওর কোলে ধরে রাখা শিশুটির দিকে।বাচ্চাটার দিকে তাকাতেই আমার ক্ষোভে সারা শরীর ফেটে পড়ে।আমার বর তখনো আমার দিকে তাকিয়ে।চোখে অপরাধ আর অসহায়ত্বের রেখা স্পষ্ট।
“আমি জানি,তুমি অবাক হয়েছো।এমনটা কখনোই কোনো মেয়ে প্রত্যাশা করেনা।তোমাকে বিয়ের আগেই জানাতে চেয়েছিলাম যে আমার একটি পুত্র সন্তান আছে।কিন্তু তোমার বাবামার অনুরোধে আর…”ফাহাদ যা’ই বলছেনা কেন,কোনো কথাই যেনো সেদিন আমার মাথায় ঢুকছিলোনা।কষ্টে আমি সারারাত কান্না করি।
না,আমার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব না এই বাচ্চাকে নিজের বাচ্চা হিসেবে গ্রহণ করা!ফলে স্বাভাবিক ভাবেই আমি বাচ্চাটাকে অবহেলা আর ঘৃণার চোখে দেখতে থাকি।যখন কান্না করে,তখন মনে হয় বাচ্চাটির গলা চেপে ধরি!উফ!অসহ্য!আমার বর প্রথম প্রথম খুব বুঝাতো,কিন্তু যখন দেখলো, আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিনা,সে হাল ছেড়ে দেয়।ফাহাদই এখন ওর বাচ্চার দেখাশোনা করে।ফাহাদের বাবামা কেউ নেই।আমি যে ওর বাচ্চাকে দেখতে পারিনা,সেটা ও জানে।প্রথম বুঝাতো,এখন আর কিছুই বলেনা।শুধু বলেছে,”একদিন তুমি হয়তো বুঝবে শীলা,আমি সেদিনটার অপেক্ষাই করছি,যেদিন তুমি আমাদের ছেলেকে নিজের ছেলে ভেবে বুকে টেনে নিবে।“
মনে মনে ভীষণ হাসি পায়।সতীনের ছেলেকে নিজের সন্তান ভাববো আমি!কখখনো না!
এদিকে আমি নিজে মা হবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি,কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছেনা।ফাহাদকে ডাক্তারের কাছে যেতে বললে ও নানারকম ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে চলে যায়।সন্দেহ হয়।তারমানে ও চাইছেনা,আমি মা হই!এই নিয়ে ওর সঙ্গে আমার তুমুল ঝগড়া বাধে।আমি ওকে যা ইচ্ছেনা তাই বলে গালিগালাজ করতে থাকি।এদিকে সতীনের ছেলে যেনো আমার গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।সারাক্ষণ ‘মা’ ‘মা’ বলে ঘ্যানঘ্যান করতে থাকে।এই ছেলে কি জানেনা,ওকে দুচোখে দেখতে পারিনা আমি!এভাবে চলে যায় বছর তিনেক।আদর চারবছরে পা রাখে।কিন্তু আমার নিজের মা হবার স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়।নিজের পেটে যে সন্তান ধারন করবো,সে সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ হয়ে আসে।
কিন্তু জেদ চেপে বসে।আমাকে নিজের সন্তানের মা যেভাবেই হোক হতে হবে।ফাহাদকে তাই অন্যদিনের মতো আজও জোর করেই ডাক্তারের কাছে নিয়ে এলাম।কিন্তু যে জ্বলন্ত সত্যের সম্মুখীন হতে হলো আমাকে,তারজন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলামনা।পায়ের নিচে মাটি সরে যায় আমার। এতোদিন ধরে জানতাম,ফাহাদের কারণে আমি মা হতে পারছিনা।মনে করতাম সতীনের ছেলেকে যাতে পর না করি,সেজন্য ফাহাদ বাচ্চা না নেয়ার টালবাহানা করে।আর আজ আমার সদ্য বিদেশ ফেরত ডাক্তার বান্ধবি ওয়াহিদার কাছ থেকে জানতে পারলাম,ফাহাদের কোনো সমস্যা নেই বরং সমস্যা আমার!ওয়াহিদাই আমাকে সব খুলে বলে।আমার জরায়ুতে আগে থেকেই সমস্যা ছিল।মাসিকের সময় প্রচন্ড ব্যথা হত,যারফলে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই পেইন কিলারের ঔষধ খেতাম।যা ধীরে ধীরে আমার মা হবার সম্ভাবনাকে কমিয়ে দেয়।এটা আমার উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে!বিয়ের ২বছর আগে অন্যমনস্ক ভাবে রাস্তা পার করতে যেয়ে আমার একটা মারাত্মক এক্সিডেন্ট হয়।ঐ এক্সিডেন্টে মাথায় আঘাতের ফলে কিছু ঘটনা আমি ভুলে যাই।ভুলে যাই আমার মা হবার সম্ভাবনা যে খুবই ক্ষীণ!
আমি কষ্ট পাবো বলে বাবা-মা আমাকে কিছুই জানায়নি এতোদিন।এমনকি ফাহাদও সব জেনেই আমাকে বিয়ে করেছে।সে-ও আমাকে কিছু বলেনি।যে ফাহাদ কে আমি অবিশ্বাস করেছি,যে ফাহাদের ছেলেকে সতীনের ছেলে ভেবে অবহেলা করেছি,আর আজ কিনা!আমার চোখ ভেঙ্গে অঝোরে কান্না নামে।ওয়াহিদা আমাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করে।
“নিজেকে শক্ত কর শীলা।জীবনে আমাদের ইচ্ছামাফিক অনেককিছুই হয়না।ফাহাদ ভাইয়া খুব ভালো মানুষ।ওনাকে ভুল বুঝিসনা।বরং সত্যটা মেনে নিয়ে তুই সুখী হবার চেষ্টা কর।মাতৃত্বের স্বাদ সৃষ্টিকর্তা কেন জানি সবাইকে দেয়না,তবে তুই সৃষ্টিকর্তার রহমতে একটা ফুটফুটে ছেলে পেয়েছিস।দেখবি,এই ছেলে তোর মাতৃত্বের কষ্ট ভুলাবে।“
শেষ কথা শুনে আমি ওয়াহিদার দিকে তাকালাম।কিছু বললাম না ওকে।
বান্ধবির চেম্বার থেকে বের হয়ে দেখি,বাইরে ফাহাদ দাঁড়িয়ে আছে।অপরাধীর চোখে ওর দিকে তাকাই আমি।ফাহাদ রাস্তায় আমাকে অনেক বুঝানোর চেষ্টা করে।তবুও বাসায় গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ি।আমি কখনো মা হতে পারবোনা।মাতৃত্বের স্বাদ নিতে পারবোনা।আমার শূন্য বুক পূর্ণ হবেনা কখনো..আমি কিভাবে এটা মেনে নিবো?কোনো মেয়ের পক্ষেই তো মানা সম্ভব না।আমি ফ্লোরে বসে ফাহাদকে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে থাকি।হঠাৎ রুম থেকে আদরের কান্না শুনতে পাই।ফাহাদ একবার আমার দিকে,আরেকবার দরজার দিকে তাকায়। ওর চোখের আকুতি বুঝতে পারি আমি।দুজনেই দৌড়ে যাই ভিতরের রুমে।ওর হাত আর মাথা ভর্তি রক্ত।ড্রেসিংটেবিলের আয়না ভাংগা।খেলতে যেয়ে আদর আয়না ভেঙ্গে মারাত্মক জখম হয় ।আমার হাত-পা অবশ হয়ে যায়।ফাহাদ যখন আদরকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে ফিরে,তখন ছেলের পুরো মাথায় ব্যান্ডেজ করা।ফাহাদ মিনতি ভরা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলে,”এবার অন্তত আদরকে নিজের সন্তান ভেবে কোলে তুলে নাও।ওর এখন তোমাকে খুব দরকার।“ফাহাদকে খুশি করার জন্য নয়,কেমন একটা ঘোরের মধ্যে থেকে আমি আদরকে কোলে নেই।
রাতে আদরের খুব জ্বর আসে।ছেলেটা যে খুব কষ্ট পাচ্ছে বুঝতে পারছি।সারারাত ঘুমাইনি আমি।আদরকে আমার বুকে ধরে রাখি,কেমন জানি মাতৃত্বের একটা স্বাদ অনুভব করি।ফাহাদকেও ধরতে দেইনি।আমার খালি মনে হচ্ছে এই ছেলে আমার খুব কাছের কেউ।তবুও কেমন যেন সঙ্কোচ কাজ করে নিজের মধ্যে।

সপ্তাহখানেক পর আদর কিছুটা সুস্থ হয়।আদরকে ঘুম পাড়িয়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায় শীলা।পাশের বাসার ছাদের এক কোণে শীলা দেখে দুটো চড়ুই পাখি তাদের বাচ্চা চড়ুইকে খাইয়ে দিচ্ছে।শীলার ভিতরটা আবার হুহু করে উঠে।মা হওয়ার ইচ্ছাটা তীব্র হয়।চোখে গুঁড়ি গুঁড়ি মেঘ জমে।যেই চোখের পানি গাল বেয়ে নিচে পরতে যাবে,ঠিক সেই সময় শীলা ওর হাতে কোমল একটি স্পর্শ অনুভব করে।
তাকিয়ে দেখে আদর দাঁড়িয়ে আছে।তাকাতেই ও অবুঝের মতো শীলাকে “মা” বলে ডেকে উঠে।
“মা তুমি কাঁদছো কেনো?বাবা বকেছে বুঝি..কেঁদোনা,বাবাকে বকে দিবো..।“কথাগুলো বলেই আদর ওর ছোট দুটি হাত দিয়ে শীলার চোখের পানি মুছে দিতে থাকে।শীলা আদরকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দেয়।
“আমার বাবা..তোকে এতোদিন আমি দূরে ঠেলে রেখেছি অবহেলায় -অবজ্ঞায়।আর তুই কিনা তোর এই মায়ের চোখের পানি মুছে দিচ্ছিস..আমি যে বড্ড পাপী হয়ে গেছি বাবা।আজ থেকে তুই আমার নিজের ছেলে।আমার সোনা টুকরা,তুই আমার মাতৃত্বের স্বাদ পূর্ন করবি…”।
ফাহাদ তাকিয়ে দেখে,আজ অনেকদিন পর আদর তার মায়ের ভালোবাসা পেয়ে বুকের সঙ্গে লেপ্টে আছে।খুব গোপনে সে চোখের পানি মোছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com