Logo
নোটিশ ::
আপনার যেকোনো সৃজনশীল লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের ঠিকানায়।আমাদের ইমেইল: hello.atharb@gmail.com

শান রাজবংশের বৃদ্ধাশ্রম এবং আমাদের দায় || মিদহাদ আহমদ

অঙ্কন ডেস্ক / ১২৪ বার
আপডেট সময় : শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২০

“ছেলে আমার মস্ত মানুষ,মস্ত অফিসার
মস্ত ফ্ল্যাটে যায় না দেখা এপার ওপার ।
নানান রকম জিনিস, আর আসবাব দামী দামী
সবচেয়ে কম দামী ছিলাম একমাত্র আমি।
ছেলের আমার,আমার প্রতি অগাধ সম্ভ্রম
আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম!”

নচিকেতার কথা ও সুরে এই গানটি শোনার সময় আমাদের কার না চোখ জলে ভেসেছে! জলে ভেজা ছলছল চোখের সামনে ধরা দেয় মায়ের প্রিয় মুখখানি। মনে মনে শপথ নিয়ে ফেলি কখনো মাকে চোখের জল ফেলতে দেবো না। সারাজীবন আঁকড়ে ধরে থাকব।

মা।শব্দটার মধ্যেই ভালোবাসার মিশ্রণ রয়েছে। ভালোবাসার আলপনায়ে মধুর হয়ে থাকে শব্দটি হলো “মা”।একজন মায়ের পরম প্রাপ্তি হলো,সন্তানের মুখের মিষ্টি হাসি,মায়ের জন্য একটু ভালোবাসা,একটু শ্রদ্ধাবোধ,ব্যস।মায়ের প্রাপ্তিটুকু খুব সামান্য।সন্তানের কাছ থেকে পাওয়া একটু ভালোবাসা,একজন মায়ের কাছে তার পরম প্রাপ্তি।

বৃদ্ধাশ্রম।শব্দটা শুনতেই কেমন একটা দুঃখের আবেশ চোখে পড়ে।বৃদ্ধাশ্রমে কারা থাকেন?অবশ্যই বৃদ্ধরা।সেই বৃদ্ধ ব্যাক্তিটি কারো মা,কারো বাবা।বৃদ্ধাশ্রম মানে বৃদ্ধদের আশ্রয়স্থল। বর্তমান সময়ের দিকে লক্ষ্য করে বললে, বলতে হবে- বৃদ্ধ পিতা-মাতার জন্য পরিবার ও স্বজনদের থেকে আলাদা আবাস বা আশ্রয়ের নাম বৃদ্ধাশ্রম। মূলত অসহায় ও গরীব বৃদ্ধদের প্রতি করুণার বোধ থেকেই হয়ত বৃদ্ধাশ্রমের সৃষ্টি- যেখানে বৃদ্ধদের প্রয়োজনীয় সেবা ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু বৃদ্ধাশ্রমের সেই ছবি এখন আর নেই। এখন যা আছে তা হল, ছোট বেলায় যে বাবা-মা ছিলেন আমাদের সবচে’ বেশি আপন, যাদের ছাড়া আমরা কিছুই করতে পারতাম না, যারা নিজেদের আরাম হারাম করে আমাদের মানুষ করেছেন নিজের সব দুঃখ কষ্ট বুকে চেপে আমার হাসি মাখা মুখ দেখার জন্য যে মা ব্যকুল থাকতেন, আমি না খেলে যিনি খেতেন না, আমি না ঘুমালে যিনি ঘুমাতেন না, অসুস্থ হলে যিনি ঠায় বসে থাকতেন আমার শিয়রে, যে বাবা-মা তিলে তিলে নিজেদের সবকিছু বিসর্জন দিয়েছেন আমাকে মানুষ করার জন্য, সেই বাবা-মায়ের শেষ বয়সের ঠিকানা এখনকার বৃদ্ধাশ্রমগুলো। মানবতার প্রতি এ এক চরম উপহাস। এক-দু’ দশক আগেও আমাদের দেশে বৃদ্ধাশ্রম তেমন একটা ছিল না। সময়ের সাথে সাথে এর সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে।
কিন্তু কেন এই বৃদ্ধাশ্রম?
এ প্রশ্নের উত্তর বড়ই করুণ। যে সন্তান বাবা-মাকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারত না, মা-বাবাই ছিল যার সারা জীবনের আশ্রয়স্থল, সে কিনা আজ বাবা-মাকে নিজের কাছে রাখার প্রয়োজন বোধ করছে না, বাবা-মাকে ঝামেলা মনে করছে। তাঁদেরকে রেখে আসছে বৃদ্ধাশ্রমে। অথবা অবহেলা ও দুর্ব্যবহার করে এমন অবস্থার সৃষ্টি করছে যেন তারা নিজেরাই ভিন্ন কোনো ঠাঁই খুঁজে নেন। অনেকের ভাব এমন, টাকা পয়সার অভাব না থাকলেও বাবা-মাকে দেওয়ার মত সময়ের তাদের অভাব আছে। তাদের সঙ্গে কথা বলার মতো পর্যাপ্ত সময় তাদের নেই। তাই বাবা-মা একা নির্জনে থাকার চেয়ে বৃদ্ধাশ্রমে অন্যদের সঙ্গে কাটানোই নাকি ভালো মনে হয়। এ ধরনের নানা অজুহাতে বাবা-মাকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। একসময় যারা নামী দামী বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক্ষক ও চাকরিজীবী ছিলেন, বর্ণাঢ্য ছিল যাদের জীবন, বৃদ্ধ বয়সে এসে নিজ সন্তানদের অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হয়ে বহু পিতা-মাতা এখন বৃদ্ধাশ্রমের স্থায়ী বাসিন্দা হতে বাধ্য হচ্ছেন। পরিবার ও সন্তান থেকেও ‘সন্তানহারা এতীম’ হয়ে জীবন যাপন করছেন। এরচে’ বড় দুঃখ মা-বাবার জীবনে আর কিছুই হতে পারে না। পত্রিকার পাতায় নজর বুলালেই এর প্রমাণ মেলে। বিভিন্ন সময়ই বৃদ্ধাশ্রম থেকে সন্তানের কাছে লেখা বৃদ্ধ পিতা-মাতার চিঠি পত্রিকায় ছাপা হয়। যা পড়ে চোখের পানি সংবরণ করা যায় না। আমরা যারা বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে অবহেলা করছি, তাদেরকে বোঝা মনে করছি, বৃদ্ধাশ্রমে তাদেরকে ফেলে রেখেছি, তারা কি কখনো ভেবে দেখেছি- আজ তারা বৃদ্ধ। তারা তো বৃদ্ধ হয়ে পৃথিবীতে আসেননি। তারা তো পরিবারের বোঝা ছিলেন না। বরং আমরা সন্তানরাই তো তাদের ‘বোঝা’ ছিলাম। তারা তো কখনো আমাদেরকে বোঝা মনে করেননি। আমাদেরকে বড় করে তোলার জন্য তারা বিন্দু পরিমাণ কমতি করেননি।

প্রাচীন চীনে পৃথিবীর প্রথম বৃদ্ধাশ্রমের সূচনা। গৃহছাড়া অবহেলিত ও অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রের এ উদ্যোগ ছিল শান রাজবংশের।শান রাজবংশের উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে এইটা ছিলো অন্যতম। খ্রিস্টপূর্ব ২২০০ শতকে পরিবার থেকে বিতাড়িত বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য আলাদা এই আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করে ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছিল এই শান রাজবংশ। প্রাচীন চীনে শান রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত বৃদ্ধাশ্রমের ধারণা বর্তমান সমগ্র বিশ্বে প্রসার লাভ করে।শান রাজবংশের এই বৃদ্ধাশ্রমের মূল লক্ষ্য ছিলো,পরিবারহীন বৃদ্ধদের আশ্রয় দেয়া। কালান্তরে এই রুপ বদলাতে থাকে।
আমরা উপহার পাই,কান্না,অবহেলায় চাপা বন্ধী আর্তনাদের যা বৃদ্ধাশ্রমের চার দেয়ালেই আবদ্ধ

বাংলাদেশে বৃদ্ধাশ্রমের ধারণা প্রবর্তন হয় ডা. এ. কে. এম আবদুল ওয়াহেদের হাত ধরে। বার্ধক্যে সবার জন্য শারীরিক-মানসিক সুস্থতা ও স্বস্তিময় জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে ডা. এ. কে. এম আবদুল ওয়াহেদের উদ্যোগে ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরাবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান। সরকারি উদ্যোগে ১৯৮৫ সালে ঢাকার আগারগাঁওয়ে নিজস্ব ভবন এবং পরে ১৯৯৩-৯৪ সালে সরকারি অনুদানে হাসপাতাল ও হোম ভবন নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে দেশব্যাপী প্রতিষ্ঠানটির ৫০টিরও বেশি শাখা রয়েছে। এ ছাড়া কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, যেমন- অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী কল্যাণ সমিতি, ব্র্যাক, ইআইডি, প্রবীণ অধিকার ফোরাম প্রভৃতি প্রবীণদের কল্যাণে কাজ করে। এই সকল সংস্থা মূলত বৃদ্ধ বয়সে যাদের সহায় সম্বল নেই, তাদেরকে মাথায় রেখেই কাজ পরিচালনা করে।কিন্তু এসবের মধ্যেও যখন দুঃখে জরাজীর্ণ মা-বাবার চোখের জল ধরা পড়ে,তখন মনে হয়,এইটা বৃদ্ধাশ্রম না।হাসি, কান্নার, ছলনার খেলাঘর।

আজ প্রতিটা বৃদ্ধাশ্রম হোক আপনের আলয়,মা-বাবাহীন ঘরে নিপাত যাক সুখের প্রতিচ্ছবি। যে সুখের আলপনায় মা-বাবা রাঙিয়ে ছিলেন সন্তানের সুখ,সেই আলপনা আজ ধূসরতায় ছেয়ে যাক।


এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com