Logo
নোটিশ ::
আপনার যেকোনো সৃজনশীল লেখা পাঠিয়ে দিন আমাদের ঠিকানায়।আমাদের ইমেইল: hello.atharb@gmail.com

মাহবুবা স্মৃতি’র গল্প “প্রস্থান”

অঙ্কন ডেস্ক / ৩১০ বার
আপডেট সময় : বৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২০

প্রস্থান
.
“সব মেয়ে খারাপ না”-কথাটা শোনামাত্র ফারহান চমকে পিছনে তাকায়। মেয়েটার দিকে তাকানো মাত্র ফারহানের চোখেমুখে একরাশ বিরক্ত এসে জমা হয়।এই মেয়েটা ওদের বাসায় আসার পর থেকেই ফারহানের মেজাজ খারাপ।মেয়েমানুষ একেবারে সহ্য হয়না ফারহানের।এই নীলা নামের মেয়েটাকে আরো না।কেননা ‘ন’ শব্দে প্রচুর এলার্জি আছে ফারহানের।তাছাড়া এই বাসায় আসার পর থেকে সারাক্ষণ সে ফারহানের পিছনে লেগে আছে। সহ্য না হওয়ারই কথা।
ফারহানের মনের অবস্থা বুঝতে পেরেই কিনা কে জানে,নীলা মিটমিট করে হাসতে থাকে।ফারহানের বুঝে আসেনা,এখানে হাসির কি হলো!!
বিরক্ত নিয়েই জিগ্যেস করে,”এভাবে হাসছেন কেন?আর এখন ছাদে কি আপনার?আমি তো এই সময় আপনাকে ছাদে আসতে বারণ করেছিলাম..”
ফারহানের প্রশ্নকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নীলা হাসি থামিয়ে বলে,”সব ছেলে যেমন খারাপ না,তেমনি সব মেয়েকেও খারাপ বলতে পারেননা।ভালো-মন্দ মিলিয়েই মানুষ।‘নারী’ এবং ‘পুরুষ’ এই দুই জাতিই ভালো-মন্দের সংমিশ্রণ। একজন দোষ করলে আমরা পুরো জাতিকে সেই দায়ভার দিতে পারিনা।সুতরাং আপনি ফোনে যে বলছিলেন,পুরো মেয়ে জাতটা খারাপ!সেটা ভুল!তাছাড়া..”
-“থামুন আপনি!”নীলাকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দেয় ফারহান।তারপর বলে,”আপনাকে বলিনি নারী-পুরুষ নিয়ে আমাকে লেকচার দিতে!ছাদে আসছেন কেন আপনি?”
-“আমি তো শুধু..”
-“কোনো কথা হবেনা।যত্তোসব..”এইটুকু বলেই ফারহান ছাদ থেকে চলে যায়।সামনেই ওর ভাবীকে পেয়ে যায়।সকল রাগ যেন এখন ভাবীর উপর পড়ে!”ভাবী,আমি আপনার খালাত বোনকে বিকেলে ছাদে যেতে নিষেধ করেছিলামনা?তাহলে কেন ঐ মেয়ে এখন ছাদে গেছে?জানেননা আমি এইসময় ছাদে থাকি!বাড়িতে কি একটু ভালোভাবে সময়ও কাটাতে পারবোনা!”
দিলরুবা কোনোমতে বলে,”রাগ করোনা ভাই।নীলাকে বুঝাচ্ছি আমি..”
-“যা খুশি তা করেন..”রুমে গিয়ে সটান করে দরজা দিয়ে দেয় ফারহান।ওর আচরণে কষ্ট পায়না দিলরুবা। বরং দেবরের জন্য খারাপ লাগে।মায়া এসে জড়ো হয়।নীলিমার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর থেকেই ফারহানের মতো সদা হাস্যোজ্জ্বল ছেলেটি পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়ে।নীলিমা আর ফারহানের সম্পর্ক ছিলো ৫বছরের।ভার্সিটিতে গিয়েই ওদের প্রেম।ফারহানের বাসায় সবাই জানতো।এই বাসায় কয়েবার এসেছেও নীলিমা।কে জানতো নীলিমার মতো ভালো মানুষী রূপ নিয়ে ফারহানকে ঠকিয়ে,ওকে না জানিয়ে আমেরিকান বর পেয়ে চলে যাবে!নীলিমার বিয়ে হয়ে যাবার পর ফারহান প্রায় পাগলের মতো হয়ে যায়।বাড়িতে চিৎকার,কান্নাকাটি করতো!আজ দুইবছর পর একটু স্বাভাবিক হয়েছে সে।কিন্তু মেয়ে মানুষ একদম সহ্য করতে পারেনা এখন। নীলার ভার্সিটি বন্ধ দেখে ওকে দিলরুবাই নিয়ে আসে বাসায়।ভেবেছিলো,কথাবার্তা,খুনসুটিতে ফারহানের মন হয়তো একটু ভালো থাকবে।কিন্তু নীলাকে একদমই সহ্য করতে পারছেনা ফারহান।দিলরুবা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
“কি ভাবছো আপু?মনে হলো লম্বা একটা শ্বাসও ফেললে।দমে কোনো আটকা পরেছে কি?”বলেই নীলা হাসি দেয়।
-“সবকিছুতে তোর ইয়ার্কি,কিছু হয়নি”দিলরুবা কথাটা বলতে বলতে নীলার দিকে তাকায়।নীলাকে খুব পছন্দ ওর।বেশ মিষ্টি চেহারা।মনে মনে অনেক পরিক্ল্পনা থাকলেও ফারহানের কারণে সম্ভব না সেটা।
-“এই যে বললে কিছু হয়নি,কিন্তু আমি তো তোমার চোখেমুখে হতাশা দেখতে পাচ্ছি।“
-“বাদ দে তো,ছাদে গিয়েছিলি কেন?জানিস না এইসময় ফারহান ছাদে থাকে!কড়া কথা শুনে ভালো লেগেছে তোর?”
-“খারাপও লাগেনি।বরং উল্টা ওনাকে রাগিয়ে দিতে পেরে খুশি লাগছে!”
-“তোরখালি আজগুবি কাণ্ড! “
-“চিন্তা করোনা,আর মাত্র কয়েকটা দিন এই আজগুবি কাণ্ড দেখবে।তারপর তো চলেই যাবো..তখন খুব মিস করবে,বুঝেছো?”
-“সত্যিই রে,তুই চলে গেলে খুব খারাপ লাগবে।“
-“তাহলে রেখে দাওনা সারাজীবনের জন্য!তুমি ভালো সঙ্গি পাবে।“বলেই নীলা চলে যায়।হতবাক দিলরুবা দাঁড়িয়ে থাকে।বিয়ের পর থেকে নীলার সঙ্গে যতোবার কথা ও দেখা হয়েছে,নীলা ততোবারই শুধু ফারহানের কথা জানতে চেয়েছে।ফারহানের রিলেশন আছে শুনে মন খারাপ হয়েছিলো যদিও। তবুও দূর থেকেই কেমন যেনো ভালোলাগা কাজ করেছে নীলার।ফারহানের ব্রেকআপ হওয়াতে নীলাও কষ্ট পেঢেছিলো সেদিন।দিলরুবার বুঝে আসেনা যদি ভালোই বাসবে, তাহলেতো ব্রেকআপের কথাশুনে খুশি হওয়ার কথা ছিলো।কষ্ট কেন পাবে?আজকের কথাটাও দিলরুবার মনে প্রশ্নের সৃষ্টি করে।
এদিকে নীলা এই বাসায় আসার পর থেকে ফারহানেরর প্রতি একটু বেশিই মনোযোগী। ফারহান ওকে সহ্য করতে পারেনা জেনেও ওর সঙ্গে কথা বলতে নীলার ভালো লাগে।ব্রেকআপ এর পর ফারহানের অবস্থা জেনে খুব কষ্ট পায় নীলা।তখন থেকেই ফারহানকে দেখার জন্য ছটফট করতে থাকে ও।তাই যখন দিলরুবা ওকে ছুটিতে আসতে বলে,সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যায়।
রাতে টেবিলে সবাই খেতে বসে।ফারহান তাকিয়ে দেখে টেবিলে সব ওর পছন্দের খাবার রান্না করে রাখা।প্রশ্নবিদ্ধ চোখে ফারহান ওর ভাবীর দিকে তাকায়।দিলরুবা ওকে খাবার তুলে দেয় প্লেটে।তারপর বলে,”খেয়ে দেখো তো ভাই,রান্নাগুলো কেমন হয়েছে।“
-“কেন?তোমার রান্না তো সবসময়ই ভালো হয়।আর আজ সবগুলো দেখছি আমার পছন্দের খাবার!কারণ কি?”
-“হুম,আগে খাও, তারপর বলছি।“
ফারহান খাবার মুখে দিয়ে বুঝতে পারে,এটা ওর ভাবীর হাতের রান্না নয়।তবে খেতে মজা হয়েছে।“
-“কি হলো!বললেনাতো,রান্না কেমন হলো?আজ নীলা রান্না করেছে..”
ফারহান শুকনো মুখে বলে,”ভালো।“ বলেই উঠে যায়।যাওয়ার আগে বলে,”আপনার বোনকে বলবেন এসব না করতে।এসব আদিখ্যেতা আমার ভালো লাগেনা।“
একটু দূরেই নীলা দাঁড়িয়ে ছিলো।ফারহানের কথা শোনামাত্র ওর চোখ ছলছল করে উঠে।ফারহান সেটা দেখেও না দেখার ভান করে চলে যায়।
হাজার বারণ করা সত্ত্বেও নীলা রোজ রান্না করে।রুমে যাওয়া বারণ,তবুও ফারহানের অগোচরে ওর রুম গিয়ে রুম গুছিয়ে দিয়ে আসে।অগোছালো রুমই ভালো লাগে ফারহানের।কিন্তু ভাবী গুছিয়ে দেয় বলে কিছু বলতে পারেনা তেমন।তবুও সে কিছুদিন আগে ভাবীকে গোছাতে নিষেধ করে।“ভাবী,আমি বলেছি তো,আমার রুম গোছানোর কোনো দরকার নেই।তবুও কেন গোছান শুনি?”দিলরুবা কিছু বলতে পারেনা।কারণ রুম গুছিয়ে দেয় নীলা!
কিন্তু নীলা চলে যাবার ঠিক একদিন আগে হাতেনাতে ধরা পড়ে।সেদিন ফারহান বাসায় একটু আগেই চলে আসে।এসে দেখে নীলা রুম গোছাচ্ছে।ফারহানের মাথায় রক্ত উঠে যায়।এক ঝটকায় সে নীলাকে রুম থেকে থাক্কা দিয়ে বের করে।দিলরুবা থাকায় নীলা পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পায়।
“এই মেয়ে,আপনার লজ্জা করেনা?এতো নিষেধ করা সত্ত্বেও কেন আমার রুমে আসেন শুনি?এতো কারণ করা সত্ত্বেও কেন আমার পিছু ছাড়ছেননা!আপনি যে মেয়েমানুষ, সেটা ভুলে যান কেন?লজ্জা হওয়া তো দরকার!আপনাকে আমি এতো অপছন্দ করা সত্ত্বেও কেন…আদিখ্যেতা দেখানো হচ্ছে?রুম গুছিয়ে, রান্না করে কি প্রমাণ করতে চান আপনি?যত্তোসব ফালতু মেয়ে কোথাকার!”
সেদিন সারারাত নীলা কান্না করে।দিলরুবা ওকে অনেক বুঝায় যাতে কান্না না করে।কিন্তু ফারহানের অগ্নিদৃষ্টি আর ঘৃণা এবং ওর কটুক্তিগুলো ওর ভিতরটা ছিঁড়ে ফেলছে!পরের কথা সহ্য করা গেলেও প্রিয় মানুষের একটু কটুক্তিই হজম করা যায়না।বরং কষ্ট লাগে।নীলারও হয়েছে সে অবস্থা।ভালো লাগার মানুষটার কাছ অপমানজনক কথা আশা করা যায়না।ওর চোখে তাই গঙ্গার ঢেউ বইছে এখন।
পরেরদিনই নীলা চলে যায়।ফারহান সকালে উঠে দেখে সবকিছু কেমন স্থবির হয়ে আছে।ওর ভাবী মন খারাপ করে টেবিলের এককোণে বসে আছে।ফারহানকেও কেমন বিধ্বস্ত দেখায়।গত রাতে ফারহান ঘুমোতে পারেনি।ওর বারবার মনে হয়েছে একটু বেশিই বলে ফেলেছে সে।নীলাকে অপমান করে কেমন অপরাধী মনে হচ্ছে ওর নিজেকে।ছটফট করে সারারাত কেটেছে ওর।কিসের জন্য ছটফট, বুঝতে পারেনা ফারহান।সিদ্ধান্ত নেয়,নীলাকে সে স্যরি বলবে এবং বুঝিয়ে বলবে যাতে এসব আর না করে।তাই ভাবীকে বসে থাকতে দেখে বলে,”ভাবী, নীলা কোথায়?”দিলরুবা অবাক হয়ে তাকায় ফারহানের দিকে।তারপর বলে,”চলে গেছে ও সকালে।তোমার ভাই ওকে ট্রেনে তুলে দিয়ে এখন বাসায় চলে আসছে।“
-“মানে!ও চলে গেছে কেন?” ফারহান প্রশ্ন করলেও দিলরুবা আর কিছু বলেনা।ফারহান মন খারাপ করে রুমে চলে যায়।কিছুক্ষণ পর ওর ভাবী এসে ওকে একটা চিঠি দিয়ে চলে যায়।যাওয়ার সময় বলে,”চিঠিটা কার,নিশ্চয় বুঝতে পেরেছো।ইচ্ছে হলে পড়ো,নয়তে ছিঁড়ে ফেলো।“
দিলরুবা ফারহানের হাতে চিঠিটা দিয়ে চলে গেলে ফারহান চিঠিটা খোলে পড়তে থাকে-
“আপনি চিঠিটা পড়বেন কিনা জানিনা,কারণ যাকে ঘৃণা করেন তাঁর চিঠি পড়তে যাবেনই বা কেন?তবুও যদি পড়েন,এই আশায় চিরকুট লিখে গেলাম।
আপনি যখন চিঠিটা পড়ছেন,তখন আমি আপনার কাছ থেকে অনেক দূরে।হ্যাঁ, আপনার কথাই ঠিক।আমার লজ্জা একটু কমই মনে হয়,নতুবা একটা সাধারণ মেয়ে হয়ে আপনাকে ভালোবাসতে গেলাম কেন?আমি আসলেই নির্লজ্জ, নির্লজ্জ আর বেহায়া না হলে কি আপনার খারাপ সময়ে কাছে থাকার চেষ্টা করে দুঃসাহস দেখাতে পারতাম?ভেবেছিলাম,নিজের সমস্তটা দিয়ে আপনাকে বুঝার চেষ্টা করবো,আপনার কষ্টের ভাগ নিবো!অথচ আমি ভুলেই গিয়েছি,আমার সে অধিকার তো নেই!আচ্ছা ভালোবাসা এমন কেন?প্রতিদানে কেবল কষ্ট পেতে হয়!হ্যাঁ, আমি আপনাকে ভালোবাসি!আর ভালোবাসি বলেই এতো অপমান করা সত্ত্বেও আমি সারাক্ষণ আপনার পিছনে লেগে থাকতাম..কিন্তু এটা যে আপনার জীবনের জন্য অসহনীয় হয়ে যাবে,বুঝতে পারিনি।তাই নিজ থেকেই চলে গেলাম।শেষে একটা অনধিকার চর্চা করছি,পারলে ক্ষমা করে দিবেন..কেমন?
‘আমি তোমাকে ভালোবাসি।আর ভালোবাসি বলেই চলে যাচ্ছি!আমার প্রস্থানে তোমার সুখ নিহিত থাকুক।‘
ইতি..
অভাগিনী! “
চিঠিটা পড়ে ফারহান স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে।চোখ দিয়ে ভুল করেই কয়েকফোঁটা জল গড়িয়ে পরে।নীলিমা ওর জীবন থেকে চলে যাবার পর মেয়েদের ওর একদমই সহ্য হতোনা।ও ভাবতো,মেয়েরা শুধু ছেলেদের কষ্ট দিতে জানে,ভালোবাসতে না।কিন্তু নীলাকে সে কি বলবে?যে কিনা যেচে কষ্টের ভাগ নিতে এসেছিলো!অথচ নিজেই সে নীলাকে চরম অপমান করে ফিরিয়ে দিলো!এই ভালোবাসাকে ফারহান কিভাবে প্রত্যাখ্যান করবে?আচ্ছা,নীলাকে কি ফারহান ফেরাতে পারবে?

লেখকঃ মাহবুবা স্মৃতি,কবি ও গল্পকার।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesDealer.Com